বঙ্গাব্দের ইতিকথা : ড. আবদুল আলীম তালুকদার

Printed Edition

বাঙালির প্রাণের উৎসব বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ এমন একসময় আমাদের দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হলো যখন দীর্ঘ ১৬ বছর পর নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক ও প্রতিশ্রুতিশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদের অর্গল ভেঙে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারের কাছে আপামর জনগণের প্রত্যাশা- দেশের সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ কায়েম হোক।

ইতিহাসবিদদের মতে, সৌরপঞ্জি অনুসারে বাংলা মাস পালিত হতো অনেক প্রাচীনকাল থেকেই। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, উড়িষ্যা, মনিপুর, কেরালা, তামিলনাড়–, ত্রিপুরা, বঙ্গ, পাঞ্জাব প্রভৃতি অঞ্চলের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই উদযাপনের রীতি ছিল।

আর সুপ্রাচীনকাল থেকে বাঙালিরাও বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটিকে নববর্ষ হিসেবে পালন করে আসছে। নববর্ষ বাঙালির সহস্র বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। তাই বাংলা নববর্ষ বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর হৃদয় নিংড়ানো উৎসব, মনের উৎসব, মননের উৎসব। এক কথায় পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির সর্বপ্রধান ও সর্বজনীন উৎসব। এই উৎসব পালনে যেমন জাতি-ধর্ম-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ থাকে না তেমনি থাকে না ছোট-বড়, ধনী-গরিবের কোনো পার্থক্য। এটি সত্যিকারার্থেই একটি সর্বজনীন উৎসব যা ভারতীয় উপমহাদেশের বাঙালিদের পাশাপাশি সারাবিশ্বে বসবাসরত বাঙালিরা প্রতি বছর সাড়ম্বরে উদযাপন করে থাকে। পুরনো বছরের ব্যর্থতা, নৈরাশ্য, ক্লেদ-গ্লানি ভুলে গিয়ে নতুন বছরকে মহানন্দে বরণ করে নেয় তারা সমৃদ্ধি ও সুখময় জীবন প্রাপ্তির প্রত্যাশায়।

প্রাচীনকাল থেকেই বর্ষ গণনায় প্রধানত দুটি পদ্ধতি চালু আছে। সূর্যের হিসেবে যে সাল গণনা করা হয় তাকে সৌর সাল বলে। সৌর সালের মাসগুলোর ঋতুর সাথে সম্পর্ক থাকে। হিজরী সন চান্দ্র সাল হওয়ায় এর মাসগুলো ঋতুর সাথে সম্পর্কিত নয়। তাই ভিন্ন ভিন্ন বছরে ভিন্ন ভিন্ন ঋতুর সংস্পর্শে আসে হিজরী নববর্ষ। মানব সভ্যতার উন্মেষকাল থেকেই সময়, দিন, সপ্তাহ, পক্ষ, মাস, বছর প্রভৃতি হিসাব নির্ণয় করার মননও সঞ্চারিত হয় এবং সেই মনন থেকে সূর্য পরিক্রমের হিসাবেরও যেমন উদ্ভব ঘটে, তেমনি চন্দ্র পরিক্রমেরও উদ্ভব ঘটে। সূর্য পরিক্রমের হিসাবে যে বছর গণনার পদ্ধতির উদ্ভব ঘটে তা সৌর সন নামে পরিচিত হয় আর চন্দ্রের পরিক্রমের হিসাবে উদ্ভাবিত সাল চান্দ্র সন নামে পরিচিত হয়।

ভারতবর্ষে মুঘল সা¤্রাজ্য পরিচালিত হতো হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে। আর হিজরী পঞ্জিকা চাঁদের ওপর নির্ভরশীল। যেহেতু কৃষকদের কৃষিকাজ চাঁদের হিসাবের সাথে মিলতো না, তাই তাদের অসময়ে খাজনা আদায়ে কৃষকদের যেন কোনো অসুবিধা না হয় সেজন্য মুঘল সম্রাট জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর সিংহাসনে আরোহনের উনিশ বছরে পদার্পণ করে কৃষি কাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার তাগিদ অনুভব করেন। সম্রাটের আদেশ অনুযায়ী তার সভাসদ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ আমীর ফতেহউল্লাহ্ সিরাজী ১৫৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ১০ অথবা ১১ মার্চ চান্দ্রসন ও সৌর সনের সাথে মিল রেখে বাংলা সনের প্রচলন করেন এবং তা কার্যকর হয় তার সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে (৫ নভেম্বর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে হিজরি সনের বর্ষকে বজায় রেখে বর্ষ গণনা ৩৫৪ দিনের স্থলে ৩৬৫ দিনে এনে একটি নতুন সন উদ্ভাবন করেন এবং সেই সাথে তিনি নক্ষত্রের নামের সাথে মিলিয়ে বাংলা বারো মাসের নামকরণও করেন। এই সন ইলাহী সন, ফসলি সন প্রভৃতি নামে শাহী দরবারে পরিচিত হলেও বাদশাহ্ কর্তৃক গঠিত সুবা বাঙ্গালা বা বাংলা প্রদেশে এসে এই সন বাংলা সন নামে ব্যাপকভাবে গৃহীত হয়। আর তখন থেকেই মানুষ বাংলা নববর্ষে তাদের হিসাব-নিকাশ, দেনা পরিশোধ, খাজনা পরিশোধ ও বিভিন্ন প্রকার লেনদেন সম্পাদন করে আসছে।

প্রথমে বাদশাহ্ আকবরের পঞ্জিকার নাম ছিল ‘তারিখ-ই-ইলাহী’ আর ঐ পঞ্জিকায় মাসগুলো আর্বাদিন, কার্দিন, বিসুয়া, তীর এসব নামে। এক তথ্য হতে জানা যায় যে, হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমকে প্রথম মাস ঠিক রেখেই বাদশাহ্ আকবর কর্তৃক গঠিত বাংলা প্রদেশ বা সুবাহ্ বাংলায় এই নতুন সন প্রতর্তিত হয়। তখন এ অঞ্চলে মহররমে ছিল বৈশাখ মাস। তাই এখানে নতুন সনের প্রথম মাস হিসেবে স্থির করা হয় বৈশাখকেই। এই বৈশাখ মাস হচ্ছে শকাব্দের দ্বিতীয় মাস। এই বাংলা সনের সাথে শকাব্দের যে মাসগুলো সংযুক্ত করা হয় তার অধিকাংশেরই নামকরণ হয়েছে কোনো না কোনো নক্ষত্রের নামে যেমন : বিশাখা নক্ষত্রের নামে হয়েছে বৈশাখ মাস, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের নামে জ্যৈষ্ঠ মাস, আষাঢ়া নক্ষত্রের নামে আষাঢ় মাস, শ্রাবণা নক্ষত্রের নামে শ্রাবণ মাস, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামে ভাদ্রমাস, অশ্বিনী নক্ষত্রের নামে আশ্বিন মাস, কৃত্তিকা নক্ষত্রের নামে কার্তিক মাস, পুষ্যা নক্ষত্রের নামে পৌষ মাস, মঘা নক্ষত্রের নামে মাঘ মাস, ফাল্গুনী নক্ষত্রের নামে ফাল্গুন মাস এবং চৈত্রা নক্ষত্রের নামে চৈত্র মাস। তবে বাংলা সনের অষ্টম মাস অগ্রহায়ণের নামকরণ কোনো নক্ষত্রের সাথে সম্পৃক্ত নয়। ধারণা করা হয়, প্রাচীনকালে নববর্ষ সূচিত হতো হেমন্তকালের যে মাসটিতে সেই মাসটির নামকরণ করা হয়েছিল অগ্রহায়ণ। অগ্রহায়ণ শব্দের অর্থ অগ্র বৎসর।

বাংলা নববর্ষ বহুমাত্রিকতায় পরিপূর্ণ। আগেকার দিনে নববর্ষের উৎসব-অনুষ্ঠান পল্লীকেন্দ্রিক এবং শুধু হালখাতা আর মেলার অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা পল্লীর সীমা ছাড়িয়ে শহরে ব্যাপ্ত হয়ে জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। এদিনে বাংলাদেশের ছোট-বড় শহর, উপশহর এমনকি গ্রামাঞ্চলে বসে বৈশাখী মেলা। মোসুমী ফলমূল, নানা রকম কুটির শিল্পজাতদ্রব্য, মাটি, কাঠ, বাঁশ, বেতের তৈরি প্রয়োজনীয় জিনিস ও খেলনাসামগ্রী যেমন : হাতি, ঘোড়া, গাড়ি, ঢাক-ঢোল, বাঁশি, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ইত্যাদি কেনার ধুম পড়ে যায়। এসব মেলায় সাপখেলা, ঘুড়ি উড়ানো, নাগর দোলার আয়োজন থাকে। জাতীয় ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে নববর্ষের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বেশ কিছুদিন যাবত পান্তা ভাত ও ইলিশ ভাজা খাওয়ার রেওয়াজ চালু হয়েছে।

বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশীদের তথা বাঙালিদের নিজস্ব উৎসব। এ উৎসব আমাদের অতীত ঐতিহ্যকে জাগ্রত করে, বর্তমানের মূল্যায়ন ঘটায়, জাতীর আগামী দিনের রূপরেখাটির দিক নির্দেশনা দেয়। তাই বাংলা নববর্ষ আমাদের গৌরব, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অঙ্গ। নববর্ষ উপলক্ষে সর্বজনীন উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা দেশের এক অবিভাজ্য সাংস্কৃতিক রূপ ফুটে ওঠে।

কিন্তু এতদসত্ত্বেও একটি ঐতিহ্যবাহী শালীন উৎসবকে সুকৌশলে বিজাতীয় সংস্কৃতি গ্রাস করে ফেলে এদেশীয় কিছু ধর্মবিদ্বেষী তথাকথিত প্রগতিশীল ভিন দেশীয় এজেন্টদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ১৯৮৯ সালে এই উৎসবকে কলঙ্কিত করে বিজাতীয় কালচার ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নামে বেহায়াপনার অপসংস্কৃতি সহজ-সরল ধর্মপরায়ণ বাংলাদেশী জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। সেখানে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও আধিপত্যের বিষয় গত ২৫-৩০ বছরে একটু একটু করে প্রবেশ করানো হয়েছে। সকল ভালো-মন্দ, মঙ্গল-অমঙ্গলের মালিক মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহকে বাদ দিয়ে বাঘ, হাতি, ঘোড়া, কুমির, ময়ূর, পেঁচাসহ বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তিকে তারা মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল- যা এই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের জন্য একটি কালিমাময় অধ্যায় এবং আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ বা চিন্তা-ভাবনার সাথে সাংঘর্ষিক। শুধু তাই নয় ভিন দেশের এদেশীয় রাজনৈতিক দালালদের আদর্শ ও নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর কাজটিও এই তথাকথিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নামে পালন করে আসছিল ঐ গোষ্ঠী। কিন্তু বর্তমান সরকার এ বছর মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে শালীনতার সাথে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে মানানসই বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে।

‘মঙ্গল’ শব্দটি বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদ। দেবীর সন্তুষ্টির জন্য মধ্যযুগে মঙ্গলকাব্য লেখা হতো। মঙ্গলের সাথে জড়িয়ে রয়েছে মন্দির কালচার। যদিও বহুকাল আগে থেকেই বাংলা নববর্ষ শালীনতা ও আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করে পালিত হয়ে আসছে। এটি নতুন উদ্ভাবিত কোনো ঘটনা নয়। অথচ আমাদের দেশের কিছু আত্মবিনাশী, আত্মধ্বংসী বা দেশবিরোধী তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আমাদের তরুণদের মোহগ্রস্ত করার জন্য এই উৎসবকে ব্যবহার করে।

আমাদের স্বর্ণালী অতীত ভুলে গেলে চলবে না। তাই সব অপসংস্কৃতিকে পায়ে দলে সোনালি অতীতকে ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। আর এ কাজটি সফল করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী তরুণ প্রজন্মকে এ দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে। তবে পাশে এসে দাঁড়াতে হবে সর্বসাধারণকে।

পরিশেষে, সব বাঙালির কাছে উদাত্ত আহ্বান- আসুন পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে আমরা আমাদের মধ্যকার সব হিংসা-হানাহানি, বিভেদ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, পরশ্রীকাতরতা, পরস্পরের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ দূর করে সবাই মিলে বাঙালিত্বের মাঝে একাকার হয়ে যাই; মুছে ফেলি মনের যতসব কালিমা। আমরা সবাই জাগ্রত হই অখণ্ড জাতীয় চেতনায়। আমরা ঋদ্ধ হই আগামীর গর্বিত প্রেরণায়। নতুন বছর আমাদের সবার জীবনে সুখ-সম্ভার-সম্প্রীতি বয়ে আনুক এটাই হোক আজ নিরন্তর প্রত্যাশা। শুভ নববর্ষ-১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। হ