ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

ভারতের জন্য ইরানে ইসরাইলি হামলা ভূ-রাজনৈতিক আঘাত

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
Diplomat

ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যে চলমান হামলাগুলো ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, কারণ উভয় দেশের সাথে তার কৌশলগত স্বার্থ এবং সম্পর্ক রয়েছে। ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে একটি দুর্বল ইরান এই অঞ্চলে ভারতের অবস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে, একই সাথে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে লাভবান করবে। তাই এই সঙ্ঘাত বিভিন্ন কারণে ভারতের জন্য খারাপ খবর।

প্রথমত, ইরান মধ্য এশিয়ায় ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। ভারত ইরানের চাবাহার বন্দরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে- যা পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরের প্রতিদ্বন্দ্বী, মধ্য এশিয়ার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপনের জন্য। মধ্য এশিয়া ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কেবল জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে নয়, বরং বিরল খনিজ পদার্থের প্রাচুর্যের কারণেও, তবে ভারতের এই অঞ্চলের সাথে সরাসরি সীমান্ত নেই, সীমিত বাণিজ্য সম্ভাবনা রয়েছে। ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাত ভারতের সংযোগ পরিকল্পনাকে বিপন্ন করবে এবং আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের দীর্ঘ প্রত্যাশিত অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।

আঞ্চলিক উত্তেজনা ভারত এবং আফগানিস্তানের মধ্যে সংযোগও ছিন্ন করবে, যা চাবাহারের মধ্য দিয়েও পরিচালিত একটি বাণিজ্য সম্পর্ক। এই পরিস্থিতিতে, চীন দ্রুত আফগানিস্তানে ভারতের স্থান দখল করবে, যেমনটি তারা দীর্ঘ সময় ধরে করার চেষ্টা করে আসছে। সাম্প্রতিক চীন-পাকিস্তান-আফগানিস্তান ত্রিপক্ষীয় সংলাপ ছিল সেই বিষয়ে বেইজিংয়ের প্রচেষ্টার সর্বশেষ উদাহরণ।

এ ছাড়া, ইরান-ইসরাইল হামলা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে। ভারত তেল আমদানির উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল, কারণ তার অপরিশোধিত তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ আসে পশ্চিম এশিয়া অঞ্চল, যার মধ্যে রয়েছে ইরান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো। এই সঙ্ঘাতের ফলে ইতোমধ্যেই বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বেড়েছে, যা উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আরো বাড়তে পারে। বিশ্লেষকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১২০ ডলারে পৌঁছতে পারে, যা মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারতের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। তেলের উচ্চ মূল্য পরিবহন খরচের উপরও প্রভাব ফেলবে, যার ফলে পণ্য ও পরিষেবার দাম বৃদ্ধি পাবে, যা পরিবারের বাজেট সঙ্কুচিত করতে পারে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এই সঙ্ঘাত এই অঞ্চলে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ইসরাইলে (প্রায় ১৮,০০০) এবং ইরানে (প্রায় ১০,০০০) উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভারতীয় বসবাস করে, তাই যেকোনো ধরনের যুদ্ধ তাদের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারে। ভারত সরকার ইতোমধ্যেই ভ্রমণ পরামর্শ জারি করেছে এবং তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

এ দিকে, ইরানের উপর ইসরাইলের আক্রমণ পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বকে বাড়িয়ে তুলবে। একটি অক্ষম ইরান ভারতের জন্য অনুকূল হবে না, তবে এটি এই অঞ্চলে পাকিস্তানকে আরো বেশি সুবিধা প্রদান করতে পারে। একটি ইসলামী দেশ হওয়া সত্ত্বেও, ইরান পাকিস্তানের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখে না; পরিবর্তে, ইরান ভারতের জন্য আরো গুরুত্বপূর্ণ কারণ তারা এই অঞ্চলে চীন-পাকিস্তান পরিকল্পনার সাথে প্রতিযোগিতা করার চেষ্টা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরান এবং পাকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে, এমনকি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তবর্তী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে উভয় পক্ষ সীমান্ত অতিক্রম করে হামলা চালায়।

সন্ত্রাসী হামলার প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি লক্ষ্যবস্তুতে ভারতের নিজস্ব হামলার পর, ভারত এবং পাকিস্তান উভয়ই বিভিন্ন রাজধানীতে সমর্থন আদায়ের জন্য একটি জোরালো প্রচারণায় লিপ্ত হয়। পাকিস্তানের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন সমর্থন নিয়ে ভারত বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা নয়াদিল্লিতে অস্বীকৃতির মুখোমুখি হয়েছিল। পাকিস্তান এবং ভারতকে সমান স্তরে রাখার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার ভারত সমালোচনা করেছে। নয়াদিল্লির উদ্বেগের সাথে আরো যোগ করে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল মাইকেল কুরিলা পাকিস্তানকে ‘ব্যতিক্রমী সন্ত্রাসবাদবিরোধী অংশীদার’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন, যদিও ভারত সিন্দুর অপারেশনের পর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে লালন-পালনে পাকিস্তানের ভূমিকার উপর জোর দিয়েছে।

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা তীব্র হলে, পাকিস্তান এবং ইরানের সাথে তার দীর্ঘ সীমান্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি মূল্যবান ভূ-রাজনৈতিক সম্পদ হয়ে উঠবে। এটি পাকিস্তানকে মার্কিন সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করতে পারে, যার বিরোধিতা ভারত নিঃসন্দেহে করবে। ভারত ইসরাইল এবং ইরান উভয়ের সাথেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, যা কয়েক দশক ধরে চলমান একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপের ফলাফল। ভারত ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক জোরদার করেছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিতে, এটি ইরানের সাথে তার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগকেও মূল্য দেয়। সঙ্ঘাতের তীব্রতা ভারতকে একটি স্পষ্ট অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারে, যা তার অংশীদারদের একজনকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। এই ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূণ। কারণ ভারত এই অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় রাখতে এবং তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। সশস্ত্র সঙ্ঘাতের সময় উভয় দেশের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে।

যদি নয়াদিল্লি চলমান ইসরাইল-ইরান উত্তেজনা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে না পারে, তা হলে কৌশলগত উদ্যোগের মধ্যে কোনো হেজিং বা পরিবর্তনই তার উচ্চাকাক্সক্ষাকে সফল করতে পারবে না।