পতিত সরকারের নির্বিচার ঋণে ঝুঁকি বাড়ছে ব্যবস্থাপনায়
রফতানি আয়ের ১৪০ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ
বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং রফতানির তুলনায় এর মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
Printed Edition
পতিত ফ্যাসিবাদী সরকারের নির্বিচারে বিদেশী ঋণ গ্রহণের কারণে বৈদেশিক ঋণ-রফতানি অনুপাত গ্রহণযোগ্য মাত্রা ছাড়িয়ে ১৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এর উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে মধ্যমেয়াদে ঋণ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৭-২৮ শীর্ষক বাজেট প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, বিগত সরকারের শেষ অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে দেশী-বিদেশী ঋণের স্থিতি আগের বছরের জিডিপির ৩৭.৬২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৯.৩৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঋণ সক্ষমতা যাচাই প্রতিবেদন (ডিএসএ) অনুসারে বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও তা ধীরে ধীরে বাড়ছে। অর্থ বিভাগ প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম ডিএসএ প্রতিবেদনে ঋণের পরিমাণ, পরিশোধ ব্যয়, অর্থনৈতিক সূচক, ঝুঁকিগুলো এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে ঋণের টেকসই মাত্রা ও ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখনো বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণঝুঁকির ক্ষেত্রে ‘নিম্ন ঝুঁকিপূর্ণ’ অবস্থানে রয়েছে। এটি আগস্ট, ২০২৪-এ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ডিএসএ প্রতিবেদনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের ঋণ এখনো টেকসই পর্যায়ে থাকলেও তা বহিঃশক ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট চাপের কারণে ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং রফতানির তুলনায় এর মূলধন ও সুদ পরিশোধের চাপ আগামী দিনে বৈদেশিক ঋণের স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে আগাম ও কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাতের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। সরকার আগামী ৩০ জুনের মধ্যে হালনাগাদ তথ্য ব্যবহার করে আরো একটি ডিএসএ প্রণয়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবহার ও ঋণ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশের ঋণ প্রোফাইল পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষে মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল জিডিপির ৩৭.৬২ শতাংশ, যার মধ্যে ২১.৫২ শতাংশ এসেছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১৬.১০ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে। ২০২৪-এর জুন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ঋণের বেশির ভাগ (৫৮ শতাংশ) এসেছে ব্যাংকিং খাত থেকে। এরপর রয়েছে জাতীয় সঞ্চয় স্কিম যার অবদান ৩৪ শতাংশ। অন্য দিকে বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সর্বোচ্চ পাওয়া গেছে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি-আইডিএ থেকে। এরপর রয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং জাপান। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ জিডিপির অনুপাত ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় ঋণ জিডিপির অনুপাত ১৫.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২১.৫২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণ জিডিপির অনুপাত ১১.৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৬.১০ শতাংশে পৌঁছেছে।
পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে এটি জিডিপির ১৫.৭৪ শতাংশ হবে। যদিও বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত নিরাপদ সীমার মধ্যে রয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক শৃঙ্খলা এবং আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ ক্ষেত্রে নিবিড় মনিটরিং ও সময়োপযোগী সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ আবশ্যক। একটি স্থিতিশীল এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি নিশ্চিত করার পথে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম রাজস্ব সংগ্রহ এবং ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধ ব্যয়- বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সরকারের বাজেট দলিলের ঋণ স্থিতির মধ্যমেয়াদি প্রক্ষেপণ অনুসারে মধ্যমেয়াদে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির অনুপাতে স্থিতিশীল থাকতে পারে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরের শেষে মোট ঋণের পরিমাণ জিডিপির ৩৭.৭২ শতাংশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণ হতে পারে জিডিপির ২১.৯৮ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ হতে পারে ১৫.৭৪ শতাংশ। বিগত বছরগুলোর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বণ্টন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়াকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে অনুদান এবং নমনীয় ঋণ (কম সুদের হার ও দীর্ঘ পরিশোধকাল) পাওয়ার সুবিধাদি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশকে তুলনামূলক উচ্চ সুদের হার ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হতে পারে, যার ফলে ঋণ পরিশোধ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।
প্রক্ষেপণে বলা হয়, এ সময় বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতির মধ্যমেয়াদি চিত্র অনেকটাই নির্ভর করবে সরকারের গৃহীত কার্যকর কৌশলগুলোর বাস্তবায়নের ওপর। যদি রাজস্ব আহরণ, রফতানি বৈচিত্র্যকরণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার না আনা যায়, তাহলে ঋণের স্থিতি এবং এ সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। তবে মধ্যমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা কৌশল সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশ এই উত্তরণের পথ দক্ষতার সাথে অতিক্রম করতে পারবে এবং উন্নত অর্থনৈতিক অবস্থানের সুফল গ্রহণের পাশাপাশি একটি টেকসই ঋণ পরিস্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম হবে।
বৈদেশিক ঋণের পরিশোধসূচি প্রসঙ্গে বাজেট দলিলে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার বৈদেশিক ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করেছে ২.০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিশোধের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ২.৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ঋণের আসল পরিশোধের পরিমাণ ৩.৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। মেয়াদপূর্তি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়বে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়নের ফলে টাকার অঙ্কে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। আগের একই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ করতে এখন আরো বেশি টাকার প্রয়োজন হচ্ছে।
দলিলে আরো বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টাকার মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে অবনমন হয়েছে, যা এই সমস্যাকে আরো তীব্রতর করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং বর্তমান তারল্যসঙ্ককট কাটিয়ে ওঠার জন্য ঋণ পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। যদিও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে, সরকারের অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণে গৃহীত নানা উদ্যোগের ফলে এটি সহনীয় সীমার মধ্যেই থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
বৈদেশিক ঋণের মুদ্রার মিশ্রণ প্রসঙ্গে বলা হয়, এটি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়, কারণ বিনিময় হার পরিবর্তনের ফলে ঋণ পরিশোধের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের বড় একটি অংশ মার্কিন ডলারে সঞ্চিত আছে, যা মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ৫৩ শতাংশ। জাপানিজ ইয়েনে ২২ শতাংশ, ইউরোতে ১৪ শতাংশ, চীনা ইউয়ানে ৭ শতাংশ এবং অন্যান্য মুদ্রায় ৪ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ রয়েছে। বৈশ্বিক প্রধান মুদ্রাগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে বিনিময় হার পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে এই মুদ্রাকাঠামো প্রণীত হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বিনিময় হারের প্রতিকূল পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশ বিভিন্ন মুদ্রার বিপরীতে হেজিংয়ের মাধ্যমে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করার পরিকল্পনা করছে বলে উল্লেখ করা হয়।