জমির উদ্দিন সরকার : বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অনন্যসাধারণ নক্ষত্র
সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর
Printed Edition
বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সংসদীয় ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যে ক’জন ব্যক্তিত্ব তাঁদের সততা, আইনি প্রজ্ঞা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার অন্যতম। তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত আইনজীবী, বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ, দক্ষ কূটনীতিবিদ এবং জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার ও অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপ্রধান। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ক্ষমতার শীর্ষবিন্দুতে থেকেও তিনি নিষ্কলুষ ভাবমূর্তি বজায় রেখেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে তাঁর অবদান অনন্য ও সুদূরপ্রসারী। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার নয়াদিঘী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ জনপদে, যা তাঁর চরিত্র গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক গণ্ডি পেরিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি কৃতিত্বের সাথে এমএ এবং এলএলবি (আইন) ডিগ্রি লাভ করেন। আইনের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে তিনি পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে যান এবং বিখ্যাত ‘অনারেবল সোসাইটি লিংকন্স ইন’ থেকে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইন পেশা শুরু করেছিলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই একজন শীর্ষস্থানীয় ও খ্যাতিমান আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
জমির উদ্দিন সরকার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে আইনের শাসন ও বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ থেকে। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নবগঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য আইনি ও রাজনৈতিক পরামর্শদাতা হিসেবে তিনি দ্রুত দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে উঠে আসেন।
তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি ল্যান্ড রিফর্মস অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং পরবর্তীকালে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এর পর থেকে তিনি প্রতিবারই জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে পঞ্চগড় থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবিধানিক ইতিহাসে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের অবদানকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায় : ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় জমির উদ্দিন সরকার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এই সময়েই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ভূমিকাটি পালন করেন।
১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে যে একদলীয় রাষ্ট্রপতি শাসিত শাসনব্যবস্থা চালু হয়েছিল, তা থেকে দেশকে মুক্ত করে পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য তিনি আইনি রূপরেখা তৈরি করেন। তৎকালীন স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলীর পরিচালনায় সংসদে তিনি ‘সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী বিল, ১৯৯১’ উত্থাপন ও পাসে অত্যন্ত দক্ষ আইনি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেন। এই সংশোধনীর ফলেই দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয়, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এই পবিত্র ও দায়িত্বপূর্ণ আসনটি অলঙ্কৃত করেছেন। স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনা করার সময় তিনি সরকারি দল এবং বিরোধী দল- উভয় পক্ষের অধিকার রক্ষায় সচেষ্ট ছিলেন। সংসদীয় কূটনীতি ও কার্যপ্রণালী বিধি প্রয়োগে তাঁর প্রজ্ঞা দলমত নির্বিশেষে সমাদৃত হয়েছিল। ২০০২ সালের জুন মাসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে, সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে জমির উদ্দিন সরকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সঙ্কটময় একটি সময়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্ব ও সশস্ত্রবাহিনীর প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেয়া পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সুচারুভাবে এবং কোনো রকম বিতর্ক ছাড়াই রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখেন।
রাজনীতি ও আইনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও জমির উদ্দিন সরকার সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে একাধিকবার অংশ নিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক ল কনফারেন্স এবং কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের বিভিন্ন সেমিনারে তিনি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের অবস্থান তুলে ধরে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। ফলে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল- আইন-নিষ্ঠা, নিয়মতান্ত্রিকতা এবং চরম সঙ্কটেও ধৈর্য ধারণ করেছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের (১/১১) অসাংবিধানিক রাজনৈতিক সঙ্কটের সময়, যখন দেশের প্রবীণ রাজনীতিবিদরা চাপের মুখে ছিলেন, তখনো তিনি দলের প্রতি অনুগত থেকে এবং সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সঙ্কট উত্তরণের পথনির্দেশনা দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী এবং সৎ মানুষ হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ সময় মন্ত্রী, স্পিকার এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির মতো সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদে থাকার পরেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো ট্যাগ লাগেনি। তাঁর এই পরিচ্ছন্ন ভাবমর্যাদা বাংলাদেশের কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম।
ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, তিনি বাংলাদেশের সাংবিধানিক যাত্রার এক জীবন্ত ইতিহাস। ১৯৯১ সালে আইনি কাঠামোর মাধ্যমে দেশকে সংসদীয় গণতন্ত্রের ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা এবং ২০০২ সালে সঙ্কটের মুখে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হতে না দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা- তাঁকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর করে রাখবে।
মৃত্যুর পূর্ব পযর্ন্ত বয়সের ভারে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, আইনি প্রজ্ঞা এবং সংসদীয় রীতিনীতির প্রতি নিষ্ঠা নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এক অনন্য অনুকরণীয় আদর্শ। বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং সংসদীয় ব্যবস্থার বিকাশে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। মহান আল্লাহ তাঁকে পরকালে উচ্চ মর্যাদায় কবুল করুন। আমিন।