বেসামরিক লোক হতাহতের ঘটনা
বলিউডের নির্মম উদযাপনের নিন্দা পাকিস্তানি তারকাদের
Printed Edition
ভারতের সামরিক বাহিনী বুধবার রাতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ‘অপারেশন সিন্দুর’ নামে চালানো বিমান হামলায় ৩১ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ৫৭ জন। হামলাগুলো হয় সিয়ালকোট, বাহাওয়ালপুর ও আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন স্থানে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তথ্য শাখা আইএসপিআর একে ‘উসকানিমূলক ও সম্পূর্ণরূপে অকারণ আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। আইএসপিআর জানিয়েছে, এই হামলার জবাবে পাকিস্তান এ পর্যন্ত ২৫টি ভারতীয় ড্রোন গুলি করে নামিয়েছে। হামলায় নিহতদের মধ্যে অন্তত চারজন শিশু এবং ছয়জন নারী রয়েছেন। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে, আহতদের চিকিৎসায় সেনাবাহিনীর মেডিকেল ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে। এই ভয়াবহ হামলার মধ্যেই ভারতীয় সামাজিকমাধ্যমে এক ধরনের বিজয়োৎসব চলতে দেখা যায়। বলিউড তারকাদের একাংশ- অক্ষয় কুমার, কঙ্গনা রানাউত, অজয় দেবগন, করণ জোহর, সিদ্ধার্থ মালহোত্রা এবং সারা আলি খান ভারতীয় বাহিনীর প্রশংসা করে ‘সন্ত্রাসবিরোধী সফলতা’ হিসেবে ঘটনাটি উদযাপন করেন। তবে তাদের কেউই বেসামরিক প্রাণহানি কিংবা নির্দোষ শিশুদের মৃত্যু নিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি। এ নিয়ে পাকিস্তানজুড়ে সামাজিকমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বহু পাকিস্তানি সেলিব্রিটি সরাসরি ভারতীয় তারকাদের ‘নিষ্ঠুরতা’, ‘নির্বিকারতা’ ও ‘দ্বিমুখিতা’র নিন্দা জানান।
তারকাদের কণ্ঠে প্রতিবাদ ও বেদনাবোধ
গায়ক হাসান রহিম তার ভিডিওবার্তায় বলেন, ‘সমস্যা এই নয় যে, পাকিস্তান পহেলগাম হামলার পেছনে ছিল কিনা- আমরা প্রমাণ চাইছিলাম, পাইনি। কিন্তু গতকাল রাতে মানুষ মরেছে। একটি শিশু মরেছে এবং আমি দেখেছি তোমাদের আনন্দ... সেটা ঘরে বসে অনুভব করেছি।’ অভিনেত্রী উরওয়া হোসেন নিজের ইনস্টাগ্রামে লেখেন, ‘পাকিস্তানে কেউ পহেলগাম হামলা উদযাপন করেনি, বরং নিন্দা করেছে। আর তোমরা শিশুদের মৃত্যু উদযাপন করছ! এটা কাপুরুষতা।’ হিনা আলতাফ সরাসরি অনুসরণকারীদের আহ্বান জানিয়েছেন, ‘যারা আমাদের কষ্টে উদযাপন করে, তাদের ফলো করবেন না, সাবস্ক্রাইব করবেন না। সবকিছুর একটি সীমা থাকা উচিত।’ জনপ্রিয় অভিনেতা হুমায়ুন সাঈদ বলেন, ‘শান্তির পক্ষে আমি সবসময়ই কথা বলেছি, আজো বলি। কিন্তু আমাদের শিশুদের যারা হত্যা করেছে, তাদের ছেড়ে দেওয়া যাবে না। পাকিস্তান তার জবাব দিতে জানে। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।’ তালহা আনজুম বলেন, ‘২৬ জন বেসামরিক মানুষ শহীদ হয়েছেন, যার মধ্যে চারটি শিশু। কিন্তু ভারতের মিডিয়া যুদ্ধকে গৌরব বলছে। আমরা এটা কোনো দিন ভুলব না।’
সংস্কৃতিগত বয়কটের ডাক
ঘটনার পর থেকেই পাকিস্তানি বিনোদন জগতে ভারতীয় চলচ্চিত্র, গান ও তারকাদের বয়কটের আহ্বান উঠেছে। অনেকে বলছেন, বলিউড দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে নেতিবাচকভাবে চিত্রিত করে বিশ্বমঞ্চে বিদ্বেষ ছড়িয়েছে। এই হামলা ও তার পরবর্তী উদযাপন সেই বিদ্বেষেরই পরিণতি। মেহবিশ হায়াত বলেন, ‘তারা আমাদের ভবন ভাঙতে পারবে, আমাদের আত্মা নয়। আমাদের সেনাবাহিনী, আমাদের জাতীয় ঐক্য আজ আরো শক্ত হয়েছে। কায়েদে আজমের সেই কথা আজও আমাদের চেতনায় জ্বলছে, ‘এই পাকিস্তানকে কেউ মুছে দিতে পারবে না।’ সারাহ খান তার ইনস্টাগ্রামবার্তায় বলেন, ‘এটা প্রতিরক্ষা নয়, এটা প্রতিশোধের নামে নৃশংসতা। গাজা হোক, কাশ্মীর হোক কিংবা পাকিস্তান- রক্তপাতই যেন নিয়তি হয়ে গেছে।’
তোমরা আর প্রতিবেশী নও : সেহর খান
নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রী সেহর খান আরও কঠোর ভাষায় বলেন, ‘তোমরা আর প্রতিবেশী নও, তোমরা এখন শত্রু। আমাদের দেশে ঢুকে আমাদের শিশুদের হত্যা করেছ। এবার শিক্ষা পেয়েছ। এবার দূরে থাকো।’
সামার জাফরি মন্তব্য করেন, ‘ঘৃণা আমাদের গ্রাস করছে রাজনীতির নামে। এমনকি ভারতের ভেতরেও অনেক মানুষ আসল সত্য জানতে পারছে না, কারণ আমাদের কণ্ঠস্বর ও পোস্টগুলো ওদের কাছে পৌঁছাতে দিচ্ছে না।’
মানবতা বনাম যুদ্ধ
হাদিকা কিয়ানি, হিনা খাজা বায়াত, আব্দুল হান্নান, এ ইউআর ব্যান্ডসহ আরো অনেক শিল্পী বারবার শান্তির পক্ষে কথা বলেছেন। তারা মনে করিয়ে দেন, যুদ্ধ কারো বিজয় নয়, কেবল নিঃশেষ। হাদিকা লেখেন, ‘আমরা শান্তি চাই, স্থিতিশীলতা চাই। আর রক্ত চাই না। আর নয়।’
বিশ্লেষকদের চোখে পরিস্থিতি
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার দুই শক্তিশালী দেশের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। পাকিস্তান শান্তির বার্তা দিলেও, দেশের অভ্যন্তরে প্রতিরোধ ও প্রতিশোধের আবেগ দিন দিন বাড়ছে।
এদিকে, জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি, যা নিয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।