দুই সপ্তাহে মণপ্রতি কমেছে হাজার টাকা

পাটের ফলন ভালো হলেও রাজশাহীর হাটে দরপতন

Printed Edition
Back--------2
রাজশাহীর নওহাটা পাইকারি হাটে বিক্রির জন্য আনা কৃষকের পাট : নয়া দিগন্ত

মুহা: আবদুল আউয়াল রাজশাহী ব্যুরো

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পাটের হাটে ভ্যান, ভটভটি ও নসিমন থেকে একে একে নামছিল কৃষকের ঘাম-শ্রমে ফলানো ‘সোনালি আঁশ’। কারো হাতে পাটের আঁটি, কারো ভ্যানে স্তূপ করে রাখা পাট। ভালো ফলনের পর এবার ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা ছিল কৃষকদের। কিন্তু হাটে এসে সেই প্রত্যাশায় ভাটা পড়েছে। দরদাম নিয়ে উৎকণ্ঠা আর হতাশাই ছিল বেশির ভাগ কৃষকের মুখে।

দুই সপ্তাহ আগেও যে পাট মানভেদে প্রতি মণ চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে; সোমবার ও বৃহস্পতিবার সকালে নওহাটা হাটে একই মানের পাটের দাম নেমে এসেছে তিন হাজার ২০০ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায়; অর্থাৎ মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি পাটের দাম কমেছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। এতে ভালো ফলন পেয়েও উৎপাদন খরচ ও প্রত্যাশিত লাভ নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন রাজশাহীর পাটচাষিরা।

কৃষকদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগী ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে হঠাৎ করেই পাটের দাম কমে গেছে। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, নতুন পাট বাজারে ওঠায় সরবরাহ বেড়েছে। এর প্রভাবেই দাম কমেছে। কৃষি ও পাট বিভাগের কর্মকর্তারাও বলছেন, এবার পাটের আবাদ ও উৎপাদনÑ দুটোই বেড়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ বাড়ায় দাম কিছুটা কমে থাকতে পারে।

হাটে পাট, নেই প্রত্যাশিত দাম : সকাল ৬টার দিকে নওহাটা পাটের হাটে গিয়ে দেখা যায়, অল্প পরিমাণে নতুন পাটের কেনাবেচা শুরু হয়েছে। দূর-দূরান্তের কৃষকরা ভ্যান, ভটভটি ও নসিমনে করে পাট নিয়ে আসছেন। ব্যবসায়ীদের সাথে দরদাম করছেন। কেউ কম দাম মেনে নিয়ে পাট বিক্রি করছেন, আবার কেউ কাক্সিত দাম না পেয়ে পাট বাড়িতে ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

পবা উপজেলার চর মাঝারদিয়ার এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম ৬৫ মণ পাট নিয়ে এসেছিলেন হাটে। দুই সপ্তাহ আগে তিনি একই মানের ১০ মণ পাট চার হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করেছিলেন। তাতে তিনি পেয়েছিলেন ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু এবার একই মানের পাটের দাম পাচ্ছেন প্রায় ৬০০ টাকা কম। সাইফুল বলেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে চার হাজার টাকা মণ দরে পাট বিক্রি করেছি। আজ একই মানের পাট তিন হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এক মণ পাটে ৮০০ থেকে হাজার টাকা কমে গেছে। আমরা তো ১০০-২০০ টাকা কমার কথা মেনে নিতে পারি। কিন্তু এভাবে একসাথে হাজার টাকা কমে গেলে কৃষক যাবে কোথায়?’ শুধু সাইফুল নন, একই অভিজ্ঞতা পবা ও আশপাশের এলাকার অনেক কৃষকের।

ফলন বেড়েছে, বেড়েছে আবাদও : কৃষি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পাটের আবাদ ও উৎপাদনÑ দুটোই বেড়েছে। চলতি মৌসুমে জেলায় ১৮ হাজার ৩৯৯ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৭ হাজার ৩০৫ হেক্টরে; অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাটের আবাদ বেড়েছে এক হাজার ৯৪ হেক্টর।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, আগাম জাতের পাটে কৃষকরা ভালো দাম পেয়েছেন। তবে নতুন পাট একসাথে বেশি পরিমাণে বাজারে উঠলে সরবরাহ বেড়ে দাম কিছুটা কমতে পারে।

পাট অধিদফতর রাজশাহীর তথ্যও উৎপাদন বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করছে। চলতি বছর জেলায় সম্ভাব্য পাট উৎপাদন ধরা হয়েছে তিন লাখ ৮১ হাজার ৬৯৬ কুইন্টাল। গত বছর উৎপাদন হয়েছিল তিন লাখ ৬০ হাজার ৪৯৪ কুইন্টাল; অর্থাৎ এবার গত বছরের চেয়ে প্রায় ২১ হাজার ২০২ কুইন্টাল বেশি পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, সরবরাহ বাড়ায় দাম কমেছে : নওহাটা হাটের ব্যবসায়ীরা অবশ্য পাটের দাম কমার পেছনে কোনো কারসাজির অভিযোগ মানতে নারাজ। তাদের দাবি, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে নতুন পাটের সরবরাহ কম থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। এখন নতুন পাট বাজারে আসায় সরবরাহ বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দাম কিছুটা কমেছে।

নওহাটার মুসকান ট্রেডার্সের পাট ব্যবসায়ী মিলন আলী বলেন, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে পাটের সরবরাহ কম থাকায় সর্বোচ্চ সাড়ে চার হাজার টাকা মণ দরে পাট কিনেছেন তারা। এখন নতুন পাট বাজারে ওঠায় সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত দরে পাট কিনছেন। তিনি বলেন, গত মাসে বেশি দামে কেনা পাট এখনো আছে। দাম না বাড়লে ব্যবসায়ীদেরও লোকসান হবে। নওহাটা পাট হাটের ইজারাদার অমল দাস বলেন, প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত হাটে পাটের বেচাকেনা হয়। প্রতি হাটে গড়ে প্রায় দুই হাজার মণ পাট বিক্রি হয়। তিনি বলেন, দুই সপ্তাহ আগে মানভেদে প্রতি মণ পাট চার হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা তিন হাজার ২০০ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় নেমে এসেছে।

চাহিদা-সরবরাহের ওপর নির্ভর করছে দাম : পাটের দরপতনের বিষয়ে পাট অধিদফতর রাজশাহীর সহকারী পরিচালক মো: নাদিম আক্তার বলেন, পাট উন্মুক্ত বাজারে কেনাবেচা হয়। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে একেকটি হাটে পাটের দাম কম-বেশি হওয়া স্বাভাবিক। তিনি বলেন, সরকার পাটের দর নির্ধারণের মতা রাখে। তবে বর্তমানে সরকারিভাবে পাটের দাম নির্ধারণ করা হয় না।

নওহাটা হাটে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দাম কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে নাদিম আক্তার বলেন, নওহাটা এলাকায় বেশ কয়েকটি জুট মিল রয়েছে। এসব মিলই স্থানীয় বাজার থেকে সবচেয়ে বেশি পাট কেনে। জুট মিলগুলো নওহাটা বাজার থেকে তুলনামূলক কম পাট কিনলে বাজারে চাহিদা কমে যায় এবং দামও কমে। আবার মিলগুলো বেশি পরিমাণে পাট কিনলে চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে দামও বাড়ে।

ভালো ফলনেও কৃষকের দুশ্চিন্তা : এবার রাজশাহীতে পাটের ফলন ভালো হয়েছে। আবাদ বেড়েছে, উৎপাদনের সম্ভাবনাও বেড়েছে। কৃষকদের প্রত্যাশা ছিল, ভালো ফলনের সাথে ভালো দাম পেলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে কাক্সিত লাভ ঘরে তুলতে পারবেন তারা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই হাটে পাটের দরপতন সেই প্রত্যাশায় বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে দুই সপ্তাহের ব্যবধানে মণপ্রতি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত দাম কমে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। কারণ পাট চাষে জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি, পাট কাটা, জাগ দেয়া, আঁশ ছাড়ানো, ধোয়া ও শুকানোÑ প্রতিটি ধাপেই কৃষকদের উল্লেখযোগ্য অর্থ ও শ্রম ব্যয় করতে হয়।