জনতা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নড়বড়ে
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
- ৩৩ গ্রাহকের পেটে ৫৭ হাজার কোটি টাকা
- বাড়ছে লোকসান ও মূলধন ঘাটতি
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ঋণঝুঁকি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাত্র ৩৩ জন বৃহৎ গ্রাহকের কাছেই জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ১৩১ কোটি টাকা। এসব ঋণগ্রহীতার বড় অংশ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত একক ঋণসীমা অতিক্রম করে ঋণ নিয়েছেন, যা ব্যাংকটির আর্থিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, কোনো গ্রাহক বা গ্রুপ যদি একটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক মূলধনের ১০ শতাংশের বেশি ঋণ নেয়, তবে তাকে ‘বড় ঋণগ্রহীতা’ হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা হয়। জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে এমন বড় ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ৩৩ জন। ব্যাংকটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ৩৩ গ্রাহকের মধ্যে অন্তত ২৭টি প্রতিষ্ঠান একক গ্রাহকের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ ঋণসীমাও লঙ্ঘন করেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ঋণ দেয়া হয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে।
বিশেষ অনুমোদনের সংস্কৃতি : বিশ্লেষকদের মতে, জনতা ব্যাংকের বড় ঋণঝুঁকির পেছনে অন্যতম কারণ হলো ‘বিশেষ অনুমোদন সংস্কৃতি’। আর এ সংস্কৃতি বজায় ছিল পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনো একক ব্যক্তি, গ্রুপ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ব্যাংকের মোট এক্সপোজার পরিশোধযোগ্য মূলধনের ২৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। এই সীমা অতিক্রম হলে নতুন ঋণ বন্ধ, ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সীমার মধ্যে নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই বিধান দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে বিশেষ অনুমোদনের আওতায় মূলধন সীমার বেশি ঋণ পাওয়া গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ২৪ জন। তখন শীর্ষ ৩১ খেলাপি গ্রাহকের কাছে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৪ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে গ্রাহক সংখ্যা ও খেলাপি ঋণের অঙ্ক উভয়ই বেড়েছে।
রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রক শিথিলতা : ব্যাংকার ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার শিথিল নজরদারিই এই সঙ্কটের মূল কারণ। বড় শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে সহজ লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছে। আওয়ামী রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তারা বারবার ঋণ পুনঃতফসিল, বিশেষ ছাড় এবং সীমা অতিক্রমের অনুমোদন পেয়েছে।
শীর্ষ খেলাপি গ্রাহকরা : ব্যাংকটির এক পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, জনতা ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর হাতে। শীর্ষ ১১ খেলাপি গ্রাহকের কাছেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪২ হাজার ৮২০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের কাছে খেলাপি ঋণ ২৩ হাজার কোটি টাকা, এস আলম গ্রুপের কাছে ৯ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ক্রিসেন্ট গ্রুপের ২ হাজার ৫০ কোটি টাকা, রানকা গ্রুপের ১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা এবং রতনপুর গ্রুপের ১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। এই তালিকায় আরো রয়েছে রিমিক্স ফুটওয়্যার, সিকদার গ্রুপ, জনকণ্ঠ গ্রুপ, লথুন ফ্যাব্রিকস, অ্যাননটেক্স গ্রুপ ও হাবিব হোটেল ইন্টারন্যাশনাল।
খেলাপি ঋণে শীর্ষে জনতা ব্যাংক : চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে খেলাপি ঋণে শীর্ষে রয়েছে জনতা ব্যাংক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে মোট ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশে। তুলনামূলকভাবে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫১ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৪০ শতাংশ এবং সোনালী ব্যাংকের ২০ শতাংশ। আর্থিক হিসাবে ২০২৪ সালে জনতা ব্যাংকের লোকসান ছিল ৩ হাজার ৭১ কোটি টাকা। একই সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের লোকসান ছিল ৯৩৭ কোটি টাকা। তবে রূপালী ও সোনালী ব্যাংক ওই বছর লাভে ছিল।
ঋণের কেন্দ্রীকরণ ও শাখাভিত্তিক ঝুঁকি : জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশ কেন্দ্রীভূত রয়েছে মাত্র পাঁচটি শাখায়। এসব শাখায় মোট ঋণের পরিমাণ ৭৬ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে লোকাল অফিস শাখাতেই ব্যাংকের মোট ঋণের ৩৯ শতাংশের বেশি বিতরণ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জনতা ব্যাংকের বর্তমান সঙ্কট কেবল একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। বড় ঋণগ্রহীতাদের লাগামহীন সুবিধা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রক শিথিলতার ফলেই জনতা ব্যাংক আজ ভয়াবহ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির মুখে দাঁড়িয়ে।