পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর জটিলতায় উদ্বেগ বাড়ছে দেশের সীমান্তে
Printed Edition
এস এম মিন্টু
- ৪ মের পর খুঁজে খুঁজে অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেবো : অমিত শাহ
- অনুপ্রবেশকারী যদি ঢোকে, তা হলে অমিত শাহের পদত্যাগ করা উচিত : মমতা
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচন ২৯ এপ্রিল। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের সরকারি দল বিজেপির শীর্ষ নেতা অমিত শাহ এবং তৃণমূলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে অনুপ্রবেশ ও এসআইআর সংশোধনী নিয়ে তুমুল বাকযুদ্ধ চলছে। এসআইআর খসড়া ভোটার তালিকা ও বিচারাধীন মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় নির্বাচনের ফলাফলের আগেই বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে দুই দেশের সীমান্তে নজরদারি ও কড়াকড়ি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজেপি তাদের নির্বাচনী প্রচারণায় অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
গতকাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক জনসভায় বলেছেন, ‘অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারবে না তৃণমূল। আমরাই সেই কাজ করব। খুঁজে খুঁজে অনুপ্রবেশকারীদের দেশ থেকে বের করে দেবো ৪ মের পর। এর আগে তিনি বলেন, অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কুমির, সাপ ও বন্যহাতি ছাড়া হবে। অমিত শাহের এমন হুমকিতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর সীমান্তে উত্তেজনার আশঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস উদ্বেগ প্রকাশ করে। তাদের দাবি, বিজেপি সরকার অনেককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে নির্বাচনী পরিকল্পনা হিসেবে।
এ দিকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ২৩৫ কিলোমিটার এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ নিয়ে রাজ্য সরকারের সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের অন্তত সাতটি রাজ্যে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। বিএসএফ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নির্বাচনকালীন সময়ে যেন কোনো রাজনৈতিক উত্তাপ বা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি ভারতের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য সতর্ক অবস্থান নেয়। ওই সময় ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে সংযোগ রক্ষাকারী কৌশলগত ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেন’স নেক’ এলাকার নিরাপত্তা রক্ষায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন ঘিরে সীমান্ত উত্তেজনা যেন না বাড়ে সেভাবেই বিজিবি টহল বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে পুশইন বন্ধ রয়েছে। তবে নির্বাচনের ফলাফলের ওপর সীমান্তে কিছুটা প্রভাব পরতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নির্বাচিত হলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বাংলাদেশ সীমান্তজুড়ে। কারণ এসআইআর খসড়া তালিকায় প্রায় ৯১ লাখ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পরায় তাদের বেশির ভাগ মানুষকে পুশইন করবে বিজেপি। এতে কোনো সন্দেহ নাই যে, দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে উত্তেজনা বাড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ধরে এনে ভারতে যুগের পর যুগ আধার কার্ডসহ সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত অমানবিকভাবে সাগরের কিনারায় ও বন-জঙ্গল দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে হাজার হাজার নারী-পুরুষকে জোরপূর্বক ঠেলে দিয়েছে। এমন অমানবিক কর্মকাণ্ডে খোদ ভারতের মানবাধিকার সংস্থাগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে। নির্বাচনের পর ফলাফল বিজেপির পক্ষে আসলে বাদ পড়া ভোটার ও তাদের সন্তানদেরও জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একদিকে ভারত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তজুড়ে কথিত নিরাপত্তায় কুমির, বিষাক্ত সাপ ও হাতির মতো বণ্যপ্রানি ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে। অপর দিকে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে ভবিষ্যতে তাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেয়া বা পুশইন করার নীলনকশার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের আগে রাজ্যে ভোটার সংখ্যা ছিল সাত কোটি ৬৬ লাখ। বর্তমানে এই সংখ্যা ছয় কোটি ৭৭ লাখ। সংখ্যালঘুদের নাম বেশি বাদ পড়েছে, এ কথা যেমন ঠিক, তেমনই শতাংশের হারে মতুয়া অধ্যুষিত জেলায় ভোটাধিকার হারিয়েছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ।
গত শুক্রবার ও শনিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনসভায় বলেছিলেন, অনুপ্রবেশকারী যদি ঢোকে, তা হলে অমিত শাহের পদত্যাগ করা উচিত। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব। আমরা অনুপ্রবেশকারী ঢোকাইনি। কারণ আমাদের ঢোকানোর ক্ষমতা নেই। সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। গত রোববার রাজ্যের ছাতনার সভা থেকে মমতা বলেন, এটা বড় দুর্নীতি। এসআইআরের নামে ওরা (বিজেপি) সর্বনাশ করেছে বাংলায়।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় বড় সংখ্যায় রয়েছে মতুয়া জনগোষ্ঠী। উত্তরবঙ্গের কিছু জায়গায় তাদের উপস্থিতি রয়েছে। রাজ্যে ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ৫৫টিতে মতুয়াদের ভোট নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যার বিচারে উত্তর ২৪ পরগনা রয়েছে শীর্ষে। খসড়া তালিকা ও বিচারাধীন মিলিয়ে এই জেলায় বাদ পড়েছে সাড়ে ১২ লাখের বেশি ভোটারের নাম। একইভাবে শতাংশের বিচারে শীর্ষে রয়েছে নদিয়া জেলা। বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশ এই জেলায় বাদ পড়েছে। মতুয়া অধ্যুষিত উত্তর ২৪ পরগনায় এই হার ৫৫ শতাংশের বেশি।
শতাংশের হারে নদিয়ার পরে সবচেয়ে বেশি মানুষ বাদ পড়েছেন হুগলি জেলায়। প্রায় ৭১ শতাংশ। এ ছাড়া দক্ষিণবঙ্গের পূর্ব বর্ধমানে ৫৮ শতাংশ, পশ্চিম বর্ধমানে ৫৪ শতাংশ, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৫১ শতাংশ বিচারাধীন ভোটার অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এই তালিকায় চার নম্বরে রয়েছে উত্তরবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর, যেখানে ৫৮ শতাংশের বেশি ভোটার অযোগ্য। প্রথম দশে রয়েছে উত্তরবঙ্গের আর এক জেলা কোচবিহার। এখানে প্রায় ৫১ শতাংশ বিচারাধীন ভোটার বাদ পড়েছেন।
এ প্রসঙ্গে মেজর জেনারেল (অব:) রোকন উদ্দিন গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকার হলেও সেই ব্যবস্থাপনার ধরন, পদ্ধতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, প্রতিবেশী আস্থা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার- যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নদী ও জলাভূমি দ্বারা গঠিত। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে জটিল করে তোলে এবং উভয় দেশের জন্যই নিরাপত্তা, চোরাচালান ও অবৈধ পারাপার একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পদ্ধতি যদি মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার পরিপন্থী হয়, তাহলে তা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা নয় বরং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দেয়।
ভারতের কুমির ও সাপের মতো প্রাণী ব্যবহার করে বাংলাদেশ সীমান্তে ‘প্রাকৃতিক বাধা’ তৈরির চিন্তাভাবনা, যদি বাস্তবে বিবেচনায় থেকেও থাকে, তা একটি গভীর উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। আধুনিক যুগে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি- ড্রোন, সিসিটিভি, স্মার্ট ফেন্সিং এসব ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রাণঘাতী জীবজন্তু ব্যবহার করার ধারণা মূলত ভয় ও আতঙ্ককে নীতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। এটি কার্যত একটি ‘ডিটারেন্স’ (ভীতি প্রদর্শন) কৌশল, যা মানবিক নিরাপত্তার চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক ভীতি সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়। ১৯৭৫ সালের দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে কোনো স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে উভয় দেশের মধ্যে ভিন্ন মত রয়ে গেছে, যা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কখনো কখনো অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।