লিবিয়ায় বাংলাদেশীদের নিজ বাসস্থানে থাকার পরামর্শ

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আবারো সশস্ত্র বাহিনীর গোলাগুলি, হামলা পাল্টা হামলা শুরু হওয়ার পরপরই লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস পুরো পরিস্থিতি মনিটরিং করার চেষ্টা করছে।

মনির হোসেন
Printed Edition
লিবিয়ায় বাংলাদেশীদের নিজ বাসস্থানে থাকার পরামর্শ
লিবিয়ায় বাংলাদেশীদের নিজ বাসস্থানে থাকার পরামর্শ | সংগৃহীত
  • ত্রিপোলীতে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ মুখোমুখি
  • ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে দেশে ফিরতে গিয়ে আটকে গেলেন ২৬ বাংলাদেশী

উত্তর আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ লিবিয়ার ত্রিপোলীতে আবারো ব্যাপকভাবে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ত্রিপোলীর প্রভাবশালী গ্রুপের একজন সদস্য গোলাগুলিতে নিহত হওয়ার পরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সব দেশের নাগরিকদের ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়ে এক বার্তায় বলেছেন, সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যেতে পারে।

এদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আবারো সশস্ত্র বাহিনীর গোলাগুলি, হামলা পাল্টা হামলা শুরু হওয়ার পরপরই লিবিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস পুরো পরিস্থিতি মনিটরিং করার চেষ্টা করছে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের নিজেদের পরিবার নিয়ে বাসায় নিরাপদে থাকার পাশাপাশি দেশটিতে থাকা বৈধ অবৈধ সব বাংলাদেশী নাগরিকদের সাবধানে বাসায় থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে (বাংলাদেশ সময়) জরুরি সতর্কবার্তায় উল্লেখ করা হয়, ত্রিপোলীতে সাম্প্রতিক সশস্ত্র যানবাহনের আগমন ও উদ্ভুত অস্থির পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব নাগরিককে নিজ নিজ বাসস্থানে অবস্থান করতে এবং নিরাপত্তার স্বার্থে অপ্রয়োজনে বাইরে বের না হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ দূতাবাস ত্রিপোলীতে অবস্থানকারী সব বাংলাদেশী নাগরিককে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বনের পাশাপাশি নিজ নিজ বাসস্থানে অবস্থান করার আহ্বান জানাচ্ছে। দূতাবাসের জরুরি বার্তায় আরো বলা হয়, একই সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে নিরাপদে থাকার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।

গতকাল লিবিয়ার ত্রিপোলীর বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করা হলে একাধিক সূত্র নয়া দিগন্তকে জানিয়েছে, ত্রিপোলী শহরে ট্যাংক, কামান, আর্টিলারী (ভারী অস্ত্রশস্ত্র) নিয়ে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ ভয়াভহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। সশস্ত্র গ্রুপের সদস্যরা এ ঘটনায় প্রাণও হারাচ্ছে। তবে আজকে পর্যন্ত এই যুদ্ধের ঘটনায় পড়ে কোনো বাংলাদেশী আহত বা নিহত হওয়ার সংবাদ তারা পাননি।

দূতাবাস সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আমরা সবাই এখন যার যার বাসায় অবস্থান করছি। বাইরে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। বাংলাদেশীরা যাতে কেউ অপ্রয়োজনে রাস্তায় বের না হন সে ব্যাপারে তারা সবাইকে সাবধানে চলাফেরার জন্য অনুরোধ জানান।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিবিয়ার ত্রিপোলী এবং বেনগাজিতে এতদিন দুটি প্রশাসন বিদ্যমান থেকে শাসন করছিল। কিন্তু গতকাল থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধটি লেগেছে লিবিয়ার ত্রিপোলীর অভ্যন্তরে থাকা একাধিক সশস্ত্র গ্রুপের মধ্যে। এতদিন যুদ্ধবিধবস্ত লিবিয়ার ত্রিপোলী শাসন করছিল স্ট্যাবিলিটি সাপোর্ট এ্যাপারেটাস (এসএসএ) গ্রুপ। এই স্ট্রং গ্রুপকেই হটিয়ে ত্রিপোলীর দখল নিয়েছে লিবিয়ার অভ্যন্তরে থাকা অপর একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ। এরপর থেকেই উভয় গ্রুপের সদস্যরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ত্রিপোলীর গর্ভমেন্ট সাপোর্টে থাকা (আন্তর্জাতিক কানেকশন) একাধিক সশস্ত্র গ্রুপটি ত্রিপোলীর পুরো এলাকা দখলে নিয়েছে। তাদের হঠাতে এসএসএএর সশস্ত্র গ্রুপটি যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তপ্ত লিবিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আবার কতদিন লাগবে তা এখনই বলা মুশকিল।

এদিকে বেনগাজি থেকে ২৬ জন বাংলাদেশী নাগরিক নিজ উদ্যোগে খালী হাতে দেশে প্রত্যাবর্তন করার আগেই বেনগাজির বেনিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হন। বিষয়টি দূতাবাসের নজরে আসার সাথে সাথেই তাদের আইনি সহায়তা দিয়ে দেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয় বলে দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল গত ১ মে বেনগাজীর পাসপোর্ট ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের সাথে এ বিষয়ে বৈঠক করে তাদের মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের দূতাবাসের জিম্মায় হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে ২৬ জনের মধ্যে ২২ জনের বিমানের ফ্লাইটের টিকিট পুনর্নির্ধারণ সাপেক্ষে দূতাবাস থেকে তাদের বহির্গমন ছাড়পত্রের ব্যবস্থা করা হয়।

গতকাল বিকেলে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে নিজের পরিচয় না প্রকাশের শর্তে বলেন, লিবিয়ার ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে বের হতে চাইলে এক্সিট ভিসা লাগে। যে ২৬ জন ডিটেনশন সেন্টারে আটকা পড়েছিল তারা সবাই রাজনৈতিক কারণে এতদিন যেতে পারছিল না। একপর্যায়ে তারা নিজেরাই দেশে ফিরতে ডিটেনশন ক্যাম্প থেকেই দালাল ধরে কন্ট্রাক্ট করে বের হওয়ার চেষ্টা করে। এরা যখন দেশে ফিরতে বিমানবন্দরে যায়, তখন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তাদের আটক করে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ওই সময় আমরা বেনগাজিতেই ছিলাম। বিষয়টি জানার সাথে সাথে তাদের মুক্ত করতে পদক্ষেপ নেয়া হয়। বিমানের টিকিট পুনর্নির্ধারণ সাপেক্ষে ২২ জনের দেশে ফেরা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। বাকি ৪ জনেরও দেশে পাঠানোর কাজ চলমান রয়েছে।