বিএনপির পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির মূলে থাকছে নদী ও খাল পুনরুদ্ধার
Printed Edition
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
বিএনপির পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে থাকছে নদী ও খাল পুনরুদ্ধার। জনগণের ভোটে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
গত ২০ জানুয়ারি রাজধানীর বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে বনানী সোসাইটি আয়োজিত দোয়া মাহফিল ও মতবিনিময় সভায় তিনি এ ঘোষণা দেন। সেখানে তারেক রহমান বলেন, জলাবদ্ধতা ও শহরাঞ্চলের জলনিষ্কাশন সমস্যা সমাধানে দেশের খাল ও জলাধারগুলোর পুনঃখনন ও সংস্কার করা হবে।
তিনি আরো বলেন, আগামী নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারলে সমগ্র বাংলাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখননের কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিবেশ ও কৃষির জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা
দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির পরিবেশবান্ধব কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা। একই সাথে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সেচব্যবস্থা উন্নত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের দীর্ঘদিনের পানিসঙ্কট সমাধানে তিস্তা ব্যারেজ উন্নয়ন এবং পদ্মা ব্যারেজের মতো বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি। বিএনপির মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মৃতপ্রায় নদী, খাল ও বিল নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে। দলীয় সূত্র আরো জানায়, এসব পরিকল্পনা কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়; বরং রাষ্ট্র মেরামতের ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারের প্রাথমিক উদ্যোগ
পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী গণমাধ্যমকে জানান, সরকারের দৃশ্যমান কাজের অংশ হিসেবে প্রাথমিকভাবে সারা দেশে এক হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে এবং খুব শিগগিরই এ কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি তিনি গাজীপুর মহানগরের ধীরাশ্রম এলাকায় গাছা খাল এবং শ্রীপুরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খনন করা চৌক্কার খাল পরিদর্শন করেছেন।
মন্ত্রী বলেন, ‘অনেক জায়গায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা খাল দখল করে মার্কেট বা বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন। অথচ এসব খাল সরকারি সম্পত্তি এবং জনস্বার্থে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত। সাধারণ মানুষের উপকারের জন্য খাল খনন কর্মসূচিকে বৃহৎ আকারে বাস্তবায়ন করা হবে।’
তিনি আরো জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন বা পুনঃখননের লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ শুরু করেছে।
৩০ হাজার খাল চিহ্নিত করতে প্রকল্প
সারা দেশে প্রায় ৩০ হাজার খাল চিহ্নিত ও মানচিত্রভুক্ত করতে ৩১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। সহযোগী সংস্থা হিসেবে কাজ করবে পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় দখল হয়ে যাওয়া খাল শনাক্ত করা, মানচিত্রভুক্ত করা এবং খালগুলোর শ্রেণীবিন্যাস ও জিও-ইনফরমেশনভিত্তিক ডাটাবেজ তৈরি করা হবে। সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের পরিকল্পনা উপদেষ্টা ইতোমধ্যে প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছেন।
তথ্যভাণ্ডারের ঘাটতি
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, দেশে আনুমানিক ৩০ হাজারের বেশী খাল রয়েছে। তবে বিএস বা আরএস খতিয়ানে অনেক খালের অস্তিত্ব এখন আর স্পষ্ট নয়। বহু স্থানে খাল ভরাট করে ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে নদ-নদীর একটি হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার থাকলেও খাল নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও একীভূত কোনো ডাটাবেজ নেই। ফলে খাল খনন, পুনঃখনন ও রক্ষণাবেক্ষণে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দেয়।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, নতুন প্রকল্পের আওতায় সমন্বিত পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার (আইডব্লিউআরএম) ধারণা অনুযায়ী সারা দেশের খালগুলোর উৎপত্তিস্থল, প্রবাহপথ, আউটফল, বেসিন ও সাব-বেসিন চিহ্নিত করা হবে। এর ভিত্তিতে একটি জিআইএসভিত্তিক খাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হবে।
খালের ধরন ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে সেগুলোকে বড়, মাঝারি ও ছোট এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত কালভার্ট, সেতু ও রেগুলেটরসহ অবকাঠামোর তথ্যও ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
নদী ডাটাবেজের সাথে সংযুক্ত হবে
এর আগে ‘বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর তথ্যাদি হালনাগাদকরণ ও তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা’ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রবাহমান নদীগুলোর তথ্য হালনাগাদ করা হয় এবং একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়। নতুন খাল প্রকল্পের ডাটাবেজ সেই নদী ডাটাবেজের সাথেও সংযুক্ত করা হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) অভ্যন্তরীণ খাল ও বিল খনন ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে। কিন্তু দেশে এখনো খালের কোনো মানসম্মত শ্রেণীবিন্যাস নেই। ফলে বিভিন্ন সংস্থা পৃথকভাবে কাজ করায় অনেক ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। কর্মকর্তাদের মতে, একটি স্থায়ী ও তথ্যনির্ভর ডাটাবেজ তৈরি হলে ভবিষ্যতে পানিসম্পদ পরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ সম্প্রসারণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।
পাইলট প্রকল্প ও চলমান কাজ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে খাল খনন কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দলটি এটিকে একটি ‘সামাজিক বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকার গঠনের প্রথম ১৮০ দিনের মধ্যে পাইলট প্রকল্পের আওতায় অন্তত এক হাজার কিলোমিটার খাল খননের দৃশ্যমান কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খাল খনন ও পুনঃখনন কার্যক্রম তদারকির জন্য প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি সেল গঠন করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকার কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা, চুনকুটিয়া ও আটি জয়নগর খালে খননকাজ চলছে। সিলেটের জৈন্তাপুরে পাঁচ-ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ খাল খননের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। এরপর সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে বাঁধ ও জলাশয় সংস্কারের কাজও হাতে নেয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিটি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ খাল ও জলাধারের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসঙ্ঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান ড. নজরুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের প্রবহমান জলাধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাল। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো খাল আয়তন ও প্রবাহের দিক থেকে নদীর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, ‘অনেক খাল এত প্রাচীন যে এখন সেগুলো প্রকৃতির স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই মনে হয়। নদী-নালার মতো খালগুলোও বাংলাদেশের নদীব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাই খাল খননকে দেশের নদীব্যবস্থার পুনরুজ্জীবনের অংশ হিসেবেই ভাবা উচিত।’
তবে বিএনপি ঘোষিত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন কর্মসূচিকে অর্থবহ করতে কারিগরি ও পরিবেশগত লক্ষ্য স্পষ্ট করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সরকারের প্রত্যাশা
পানিসম্পদমন্ত্রী মো: শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচিকে নতুন করে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে দেশব্যাপী বড় পরিসরে কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, “এই কর্মসূচির প্রথম ধাপে ১৮০ দিনের মধ্যে এক হাজার কিলোমিটার খালের খননকাজ সম্পন্ন হবে। এর সুফল দ্রুতই মানুষ পেতে শুরু করবে।’
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের এই উদ্যোগ দেশের জলজ বাস্তুসংস্থানের জন্য একটি নতুন মাইলফলক হয়ে উঠবে।