শোকাতুর বিদায়

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ

Printed Edition
year-5
বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ

আরণ্যক শামছ

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন কোনো সাধারণ রাজনীতিকের পথচলা নয়, বরং এটি একটি জাতির ক্রান্তিলগ্নে গৃহবধূ থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার এক মহাকাব্যিক রূপান্তর। ১৯৪৫ সালে অবিভক্ত ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্ম নেয়া এই মহীয়সী নারীর শৈশব ও কৈশোর ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও শান্ত। ১৯৬০ সালে সেনাকর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর তিনি মূলত একজন নিভৃতচারী গৃহিণী হিসেবেই জীবন অতিবাহিত করছিলেন। এমনকি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্দী থাকা অবস্থায়ও তার পরিচয় ছিল একজন সেনাপতির স্ত্রী হিসেবে। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে এক মর্মান্তিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদতবরণ করার পর বাংলাদেশের রাজনীতির দৃশ্যপট আমূল বদলে যায়। তার অবর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যখন চরম নেতৃত্ব সঙ্কটে এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, ঠিক তখনই দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রাণের দাবিতে ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

রাজনীতিতে তার অভিষেক ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং কণ্টকাকীর্ণ। ১৯৮৩ সালে তিনি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই সময় বাংলাদেশে জেঁকে বসেছিল এইচ এম এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার। তৎকালীন সময়ে অনেক সিনিয়র নেতা যখন প্রলোভনের মুখে দল ত্যাগ করছিলেন বা ক্ষমতার সাথে আপস করছিলেন, খালেদা জিয়া তখন হিমালয়ের মতো অটল ছিলেন। তার এই দৃঢ় অবস্থানের কারণেই তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। তিনি সাত দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে রাজপথ কাঁপিয়ে তুলেছিলেন। বারবার তাকে গৃহবন্দী করা হয়েছে, কারারুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে; কিন্তু তিনি নতিস্বীকার করেননি। তার এই একনিষ্ঠ গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের ফলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশ পুনরায় গণতন্ত্রের আলো দেখতে পায়।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। সেই নির্বাচনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ২০ মার্চ ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। এটি কেবল তার ব্যক্তিগত বিজয় ছিল না; বরং এটি ছিল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক অনন্য উদাহরণ। তার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদেই তিনি একটি ঐতিহাসিক কাজ সম্পন্ন করেন, তা হলো সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করা। তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী ছিলেন এবং সংসদের কাছে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

তার শাসনের প্রথম মেয়াদে তিনি শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিলেন, তা আজ বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করা ছিল তার দূরদর্শী চিন্তার ফসল। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতিকে শিক্ষিত করতে হলে আগে মায়েদের এবং মেয়েদের শিক্ষিত করতে হবে। এর পাশাপাশি তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন এবং দেশজুড়ে ‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করেন যা গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। পরিবেশ রক্ষায় তার নেয়া পলিথিন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং দুই স্ট্রোক বিশিষ্ট ইঞ্জিন (বেবি ট্যাক্সি) তুলে দিয়ে সিএনজিচালিত যান প্রবর্তন ছিল তৎকালীন সময়ের সাপেক্ষে অত্যন্ত সাহসী ও আধুনিক পদক্ষেপ।

বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ছিল ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’-এই আদর্শের ওপর ভিত্তি করে। তিনি সার্ক (ঝঅঅজঈ) ফোরামকে শক্তিশালী করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং মুসলিম উম্মাহর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তার এই রাজনৈতিক উত্থান কেবল অভ্যন্তরীণ শক্তিতে নয়; বরং আন্তর্জাতিক মহলেও তাকে একজন প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে তার অবদান ছিল অনস্বীকার্য। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তার এই শাসনকালকে বাংলাদেশের আধুনিক উন্নয়নের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করা হয়।

তবে এই পথ মসৃণ ছিল না। ১৯৯৪ সাল থেকে বিরোধী দলের টানা হরতাল, সংসদ বর্জন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির মুখে তাকে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। গণতন্ত্রের স্বার্থে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে তিনি শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং পদত্যাগ করেন। এটি ছিল তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত ক্ষমতার চেয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার জীবনের এই প্রথম পর্বটি ছিল মূলত দেশপ্রেম, ধৈর্য এবং অদম্য সাহসের সমন্বয়, যা তাকে কোটি মানুষের হৃদয়ে ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে স্থান করে দিয়েছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় পর্বটি শুরু হয় ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর থেকে, যখন তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রীর ভূমিকা পালন করেন। এই সময়টি ছিল তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের ভেতরে থেকে সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা এবং রাজপথে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার এক দ্বিমুখী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করেন। এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন। তার এই রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় সাফল্য নিয়ে আসে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো (পূর্ণ মেয়াদে) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নির্বাচনটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না; বরং এটি ছিল জনগণের পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রতি এক বিশাল গণসমর্থন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তার দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাক্ষী হয়। খালেদা জিয়ার সরকার এই সময়ে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে সফল হয় এবং দারিদ্র্য বিমোচনে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিওগুলোর কাজের সুযোগ করে দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করার ক্ষেত্রে তার সরকারের ভূমিকা ছিল সহায়ক। এই সময়েই বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিপ্লব শুরু হয়। তিনি মোবাইল ফোনের ওপর থেকে মনোপলি বা একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে টেলিকম সেবা পৌঁছে দেন। ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের প্রসার এবং কম্পিউটার আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের মতো সিদ্ধান্তগুলো আজকের ‘ডিজিটাল’ বাংলাদেশের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। যমুনা বহুমুখী সেতুর কাজ সম্পন্ন হওয়া এবং সড়ক পথে যোগাযোগব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন তার উন্নয়ন দর্শনের অন্যতম বড় উদাহরণ।

রাজনীতির এই তুঙ্গে থাকা অবস্থায় তাকে বহুমুখী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করতে হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের উত্থান তার সরকারের ভাবমর্যাদাকে সঙ্কটে ফেলেছিল। যদিও তিনি কঠোর হাতে জঙ্গিবাদ দমনে কাজ শুরু করেছিলেন এবং জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাইসহ শীর্ষ জঙ্গিদের গ্রেফতার ও বিচার নিশ্চিত করেছিলেন, তবুও বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে এটি ছিল এক গভীর ক্ষত, যা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনীতির মেরুকরণকে আরো বিষাক্ত করে তোলে। বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের অভিমত অনুসারে, খালেদা জিয়া সবসময় চেয়েছেন একটি শক্তিশালী বিরোধী দল থাকুক; কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিকূলতা সেই পরিবেশকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে।

২০০৬ সালের শেষের দিকে যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে সঙ্কট তৈরি হয়, তখন থেকেই শুরু হয় তার জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (ওয়ান-ইলেভেন) জরুরি অবস্থা জারির পর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। সেই সময় অনেক বাঘা বাঘা রাজনীতিক সংস্কারের নামে দলত্যাগ করলেও খালেদা জিয়া ছিলেন অবিচল। তাকে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার দুই সন্তান- তারেক রহমান ও মরহুম আরাফাত রহমান কোকোকেও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। তৎকালীন সময়ে বিশ্বনেতাদের অনেকেই তাকে দেশত্যাগের পরামর্শ দিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি সেই বিখ্যাত উক্তিটি করেছিলেন : ‘বিদেশে আমার কোনো জায়গা নেই, এই দেশই আমার সব। আমি কোথাও যাবো না।’ তার এই অনমনীয় মনোভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে তার প্রতি এক নতুন ধরনের আবেগ ও শ্রদ্ধার জন্ম দেয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণ করে তিনি সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে ফিরে আসেন। এরপরের এক দশকে তাকে কেবল রাজনৈতিকভাবেই নয়, ব্যক্তিগতভাবেও চরম লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। দীর্ঘ ৪০ বছরের বসতবাড়ি থেকে তাকে উচ্ছেদ করা ছিল তার জীবনের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি। তবুও তিনি দমে যাননি। তিনি বারবার কারাবরণ করেন। কারাগারে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং বিদেশে চিকিৎসার আবেদন নাকচ হওয়ার ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক মহলে মানবাধিকারের প্রশ্নে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

বিশ্ব রাষ্ট্রপ্রধানদের দৃষ্টিতে খালেদা জিয়া ছিলেন একজন দৃঢ়চেতা নেত্রী। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান থেকে শুরু করে সৌদি আরবের রাজপরিবার পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন, তিনি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারে কাজ করতে চান। তার এই দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় চড়াই-উতরাই ছিল অনেক; কিন্তু তিনি কখনোই তার আদর্শিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হননি। তার রাজনৈতিক জীবনের এই দ্বিতীয় পর্বটি মূলত ত্যাগ, ধৈর্য ও অবিরাম সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল মূলত এক নিঃসঙ্গ কিন্তু পাহাড়সম দৃঢ় সংগ্রামের গল্প। তার জীবনের এই পর্যায়ে তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে নন; বরং একজন জাতীয় অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তার অবর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যে মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে তার অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। খালেদা জিয়া এমন একজন নেত্রী ছিলেন, যিনি ক্ষমতার বাইরে থেকেও দেশের কোটি মানুষের হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। তার ঐতিহাসিক অবদানের কথা বলতে গেলে সবার আগে আসে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তার অটল অবস্থান। তিনি বিশ্বাস করতেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে যখন এদেশের মানুষ মাথা উঁচু করে বিশ্বদরবারে কথা বলতে পারবে। তার শাসনামলে নেয়া পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলো এবং দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রগুলো (চজঝচ) আজও দেশের অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে, গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার জন্য তার নেয়া কমিউনিটি ক্লিনিককেন্দ্রিক প্রাথমিক ধারণা এবং পল্লøীবিদ্যুৎ কর্মসূচির ব্যাপক বিস্তার গ্রামীণ বাংলার চিত্র বদলে দিয়েছিল। তার আমলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প যে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছিল, তা আজ দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, খালেদা জিয়া ছিলেন একজন ‘মডারেট’ বা উদারপন্থী মুসলিম নেত্রী, যিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক চেতনার এক চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তার সম্পর্কে বিভিন্ন সময়ে বিশ্ব রাষ্ট্রপ্রধানরা বলেছেন, তিনি মুসলিম বিশ্বের নারী নেতৃত্বের এক অনন্য

আলোকবর্তিকা। বিশেষ করে ওআইসি (ঙওঈ) ভুক্ত দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে তিনি এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যার সুফল আজও দেশ ভোগ করছে।

এখন প্রশ্ন আসে তার অবর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বা তার রাজনীতির ময়দান থেকে প্রস্থান বাংলাদেশের ক্ষমতায় এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল। বিএনপির মতো একটি বিশাল রাজনৈতিক দলের জন্য খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি কেবল একজন নেত্রীর অভাব নয়; বরং একটি আদর্শিক ছত্রের অভাব। তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান দলের হাল ধরলেও, খালেদা জিয়ার যে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজপথের আপসহীন ইমেজ ছিল, তা অর্জন করা এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়া ছিলেন এক বিশাল স্তম্ভ। তার অনুপস্থিতিতে দেশের দ্বিদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে, যার ফলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আজ নানা প্রশ্নের সম্মুখীন।

ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ক্ষমতার মেরুকরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খালেদা জিয়ার আদর্শ, অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী মূল্যবোধের সমন্বয়ে যে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ তিনি লালন করতেন, তা এ দেশের মানুষের একটি বড় অংশের মজ্জাগত। তার অবর্তমানে এ আদর্শকে ধারণ করে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মতে, খালেদা জিয়ার বড় সাফল্য ছিল তিনি বিএনপিকে একটি ‘প্রান্তিক মানুষের দলে’ রূপান্তর করতে পেরেছিলেন। তার অবর্তমানে ক্ষমতার রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দলটি কতটা সুসংগঠিতভাবে তার এই উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিতে পারে তার ওপর। যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তন নিশ্চিত না হয়, তবে তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক শূন্যতা চরমপন্থা বা অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানের পথ প্রশস্ত করতে পারে, যা দেশের জন্য শুভকর নয়।

বেগম খালেদা জিয়ার বিভিন্ন সাক্ষাৎকার পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি সবসময়ই তরুণ প্রজন্মের ওপর আস্থা রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘তারুণ্যের শক্তিই পারে একটি দেশকে বদলে দিতে।’ তার অবর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের গণতান্ত্রিক চেতনা এবং নাগরিক বিশ্বাসের ওপর তার প্রস্থান এক গভীর দাগ কেটে যাবে। সাধারণ মানুষের মনে তিনি বেঁচে থাকবেন সেই নেত্রী হিসেবে, যিনি শত জুলুম সহ্য করেও নিজ দেশের মাটি আঁকড়ে পড়েছিলেন। তার মৃত্যু কেবল একটি দেহের প্রস্থান নয়; বরং একটি জীবন্ত ইতিহাসের সমাপ্তি। তবে ইতিহাস সাক্ষী দেয়, বড় মাপের রাজনেতারা শারীরিক মৃত্যুর পর আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠেন তাদের রেখে যাওয়া আদর্শের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং একটি অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে তার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন। তার অভাব বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক মোড়ে অনুভূত হবে। রাজপথের স্লোগানে, সংসদের বিতর্কে কিংবা জাতীয় সঙ্কটে মানুষ বারবার ফিরে তাকাবে সেই আপসহীন নেত্রীর স্মৃতির দিকে। পরিশেষে বলা যায়, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাকে বাদ দিয়ে এ দেশের গণতন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। তার জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামী দিনের নেতৃত্ব যদি দেশপ্রেমে উজ্জীবিত হয়, তবেই তার স্বপ্ন পূরণ হবে।