অভ্যন্তরীণ নিরীা প্রতিবেদনে দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর চিত্র

বিদেশে অগ্রণী ব্যাংকের দুই সাবসিডিয়ারিতে ব্যাপক অনিয়ম

Printed Edition

সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সাবেক-বর্তমান সিইওদের বিরুদ্ধে অর্থ তসরুপের গুরুতর অভিযোগ

আশরাফুল ইসলাম

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির বিদেশী দু’টি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী একচেঞ্জ হাউজ প্রাইভেট লিমিটেড, সিঙ্গাপুর এবং অগ্রণী রেমিট্যান্স হাউজ এসডিএন, বিএইচডি, মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে যে অনিয়ম ও অর্থ অপব্যবহারের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল, তার চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীা প্রতিবেদনে। সাত বছরেরও বেশি সময়ের আর্থিক হিসাব (১ জুলাই ২০১৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪) পর্যালোচনা করে নিরীকরা তহবিল তসরুপ, বিধি লঙ্ঘন, মতার অপব্যবহার, ‘পকেট ব্যাংকিং’ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছেন। অডিট অ্যান্ড ইন্সপেকশন ডিভিশন-২, প্রধান কার্যালয়, ঢাকার উদ্যোগে পরিচালিত এই নিরীা প্রতিবেদন সম্প্রতি অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সচিবালয়ে গৃহীত হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষায়, এসব অনিয়ম ‘ব্যাংকিং নীতিমালা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও সুশাসনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী’ এবং এর অনেকগুলোই সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

সিঙ্গাপুর একচেঞ্জ হাউজ : গুরুতর আপত্তি

নিরীা প্রতিবেদনে বলা হয়, অগ্রণী একচেঞ্জ হাউজ প্রাইভেট লিমিটেড, সিঙ্গাপুরে বেশ ডজনখানেক গুরুতর আপত্তি চিহ্নিত হয়েছে। এতে জড়িত অর্থের পরিমাণ এক লাখ ছয় হাজার ৪০৪ দশমিক ৯২ সিঙ্গাপুর ডলার। এর মধ্যে মাত্র ৪৭ হাজার ৭৪ ডলার আদায় করা সম্ভব হয়েছে। ফলে এখনো অনাদায়ী রয়েছে ৫৯ হাজার ৩০৩ দশমিক ৭৮ ডলার, যা কার্যত ব্যাংকের প্রত্য তি।

প্রতিবেদনে সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ আনা হয়েছে। সাবেক সিইও ও পরিচালক আবু সুজা মো: শরীফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৬৩ হাজার ৭২০ ডলারের বেশি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিরীকদের মতে, প্রবাসীদের জমাকৃত অর্থ ব্যাংকে জমা না দিয়ে তিনি তা ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করেছেন এবং হুন্ডি চক্রের সাথে যোগসাজশে অবৈধ লেনদেন পরিচালনা করেছেন। রেমিট্যান্স জমাদানকারীর সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে ব্যাংক থেকে অর্থ পরিশোধ করা হলেও কভার ফান্ড যথাসময়ে ফেরত না দেয়ায় ব্যাংককে বড় অঙ্কের তির মুখে পড়তে হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, দেশে ফেরার সময় তিনি ক্যাশের হিসাব বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হন। এমনকি তৎকালীন ব্যাংক ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তে ব্যাংকের খরচে তাকে পুনরায় সিঙ্গাপুর পাঠানো হলেও ঘাটতি অর্থের হিসাব দিতে পারেননি। দীর্ঘ সময় পার হলেও তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়াকে নিরীকরা ‘নজিরবিহীন ও উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বর্তমান সিইও ও পরিচালক মীর বায়েজীদ হোসাইনের বিরুদ্ধে ১৬ হাজার ৫৮৫ ডলারের অনিয়মের দায় পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে সাবেক সিইওর দুর্নীতি আড়াল করা এবং প্রকৃত তথ্য গোপনের অভিযোগ রয়েছে। নিরীকদের ভাষায়, আয়ের অর্থ যথাযথ হিসাবে না দেখানো, অনুমোদন ছাড়া ব্যয়, প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার এবং ‘পকেট ব্যাংকিং’য়ের মাধ্যমে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

মালয়েশিয়া রেমিট্যান্স হাউজ : বিধি লঙ্ঘনের হরিলুট

অগ্রণী রেমিট্যান্স হাউজ এসডিএন বিএইচডি, মালয়েশিয়ায় অনিয়মের চিত্র আরো ভয়াবহ। মাত্র ৭টি আপত্তিতেই উঠে এসেছে ১ লাখ ২৪ হাজার ১৬৮ দশমিক ৩৭ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের অনিয়ম। এর মধ্যে প্রথমে ৪৬ হাজার ৬৪১ রিঙ্গিত আদায় হয়। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষের চাপে অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধ করেছে। বর্তমান সিইও ও পরিচালক সুলতান আহমেদের বিরুদ্ধে একাই ৫২ হাজার ৯৪৩ রিঙ্গিতের অনিয়মের দায় পাওয়া গেছে। সাবেক সিইও খালেদ মোরশেদ রিজভীর বিরুদ্ধে ১৬ হাজার ৫৮৪ রিঙ্গিত, সাবেক সিইও লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে ৬ হাজার রিঙ্গিত এবং সাবেক সিইও ওয়ালী উল্লাহর বিরুদ্ধে দুই হাজার রিঙ্গিত জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

নিরীায় দেখা যায়, নিয়োগ নীতিমালা লঙ্ঘন করে নির্ধারিত সময়ের আগেই পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থান, অবৈধভাবে চিকিৎসা ও শিশু শিা ভাতা গ্রহণ, প্রতিষ্ঠানের অর্থে ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ও টোল বিল পরিশোধ, ভ্রমণ ব্যয়ের ভুয়া কাগজপত্র, দোকানভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থ নিজের পকেটে রাখা সবমিলিয়ে একটি সংগঠিত লুটপাটের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

কিভাবে হয়েছে অনিয়ম

নিরীা প্রতিবেদনে অনিয়মের ধরন বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে পরিবার নেয়ার বিধান নেই। এর পরেও দুই তিন মাসের মধ্যে পরিবার নিয়ে মালয়েশিয়ায় স্থানান্তর করে চিকিৎসা ও শিশু শিা ভাতা গ্রহণ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ও টোল বিল পরিশোধ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের তহবিল থেকে। নতুন শাখা খোঁজার নামে ভ্রমণ ব্যয় দেখানো হলেও তার পে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। দোকানভাড়া বাবদ প্রাপ্ত অর্থ সংশ্লিষ্ট হিসেবে জমা না করে সিইও সুলতান তার নিজ পকেটে রেখে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন। নিরীক্ষা চলাকালীন ও নিরীক্ষা পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু অর্থ জমা দেয়া হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের অর্থ অন্যায়ভাবে নিজের পকেটে রেখে অপত্তির মুখে ফেরত প্রদান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি তহবিল তসরুপের ন্যায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এ ছাড়া শাখা পরিদর্শনের নামে পরিবহন ব্যয়, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া প্রশিণ ব্যয় এবং বোর্ড সভার উপস্থিতি ভাতা গ্রহণে নির্ধারিত নীতিমালা সম্পূর্ণ উপো করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। শুধু বোর্ডসভা ভাতা খাতে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের পরিমাণই ৩০ হাজার রিঙ্গিত।

দুর্নীতিপরায়ন এই সিইও দ্বারা দেশে-বিদেশে অগ্রণী ব্যাংকের ভাবমূর্তি প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ব্যাংকের মধ্যে এদের বাঁচাতে একটি অসাধু চক্র (যারা ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে পরিচিত) মরিয়া হয়ে উঠেছে। অতীতে বহুবার বিদেশে অবস্থিত দু’টি এক্সচেঞ্জ হাউজে নিরীক্ষা দল পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও এ অসাধু চক্র তা হতে দেয়নি। ৫ আগস্ট পরবর্তী বর্তমান ব্যবস্থাপনা এবং চেয়ারম্যান দ্বারা নিরীক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু কি অজানা শক্তির কারণে এই অসৎ চক্র ও লুটেরা এখনো শাস্তির আওতায় আসেনি তা বোধগম্য নয়।

প্রশ্নের মুখে সুশাসন ও জবাবদিহি

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিদেশী সাবসিডিয়ারিতে এ ধরনের অনিয়ম প্রমাণ করে যে, ব্যাংকের তদারকি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্বল। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রশ্ন উঠেছে ব্যবস্থাপনার ভূমিকা নিয়েও। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে এই দু’টি এক্সচেঞ্জ হাউজই সাবেক এমডি শামসুল ইসলামের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম সংগঠিত হওয়ার খবর জানাজানি হলেও এ বিষয়গুলো কখনো ব্যাংকের নজরে আসেনি। ‘বঙ্গবন্ধু কর্নারের’ জনক হিসেবে ব্যাংকিং পাড়ায় তিনি ধরাকে সরা জ্ঞান করেছেন। অনিয়মিতভাবে এবং কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় তার পছন্দের লোক পাঠিয়ে তার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ বিভিন্ন সময় উত্থাপিত হয়েছে। নিরীা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপ দায়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনাদায়ী অর্থ দ্রুত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসী আয় ব্যবস্থাপনায় যুক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম দেশের রেমিট্যান্স খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে। এখন দেখার বিষয়, অভ্যন্তরীণ নিরীার সুপারিশ বাস্তবায়ন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আদৌ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয় কি না- নাকি অতীতের মতোই এসব প্রতিবেদন ফাইলবন্দী হয়ে থাকবে।

কী হওয়া উচিত

নিরীা প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, অনাদায়ী অর্থ আদায় এবং ফৌজদারি তদন্ত ছাড়া ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক তদন্ত নয়- মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী তদন্ত, সম্পদ জব্দ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রতিবেদন এখন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকব্যবস্থার জন্য একটি পরীার কাগজ। এটি যদি অতীতের মতোই ফাইলবন্দী হয়ে যায়, তবে তা হবে অপরাধীদের জন্য নীরব সুরা বর্ম। আর যদি সত্যিকার অর্থে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়, তবে সেটিই হবে সুশাসন ও জবাবদিহির পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।

সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় অগ্রণী ব্যাংকের এই দু’টি সাবসিডিয়ারিতে সংঘটিত অনিয়ম শুধু আর্থিক দুর্নীতির গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার ভঙ্গুরতার প্রতিচ্ছবি। অভ্যন্তরীণ নিরীা সেই চিত্র উন্মোচন করেছে। এখন প্রশ্ন একটাই- এই তথ্য কি কেবল প্রতিবেদনের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এর ভিত্তিতে সত্যিকার অর্থে জবাবদিহি, বিচার ও সংস্কারের পথ খুলবে? দেশের রেমিট্যান্স খাতের স্বার্থে এবং ব্যাংকিংব্যবস্থার আস্থার জন্য দ্বিতীয় পথটিই এখন একমাত্র গ্রহণযোগ্য বিকল্প।

ব্যাংকের এমডির বক্তব্য : এ বিষয়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আনোয়ারুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী দাবিকৃত অর্থ আগামী ১৫ মাসের মধ্যে পরিশোধে ব্যর্থ হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। পাশাপাশি টাকা পরিশোধের পরেও গুরুতর অনিয়মের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর অপেক্ষাকৃত কম অনিয়মের দায়ে সতর্ক করা হবে।