সেনাসদরের ব্রিফিং

নির্বাচনে আইনের মধ্যে থেকে প্রয়োজনে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগ

Printed Edition
Back------1
গুলিস্তানে জাতীয় স্টেডিয়ামে সেনা ক্যাম্পে বক্তব্য রাখেন সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভোট কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করতে পারে, তবে তা হবে সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ অনুসরণ করে। গতকাল সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদফতরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানে রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কিত বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান।

নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোর অবস্থা বিবেচনায় যদি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয় সে েেত্র সেনাবাহিনীর রুলস অব এনগেজমেন্টটা কী হবে? বিজিবি বলেছে তারা কোনো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করবে না। এ েেত্র আপনারা কী করবেন জানতে চাইলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, সেনাবাহিনীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে এনগেজমেন্ট বলে দেয়া আছে। আমরা আইনের আওতায় থেকে সে রুলস অব এনগেজমেন্ট অনুসরণ করে আমাদের দায়িত্ব পালন করে থাকি। যদি সত্যি সত্যি কোনো েেত্র অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয় তা হলে রুলস অব এনগেজমেন্টে যে ক্রমান্বয়ে বলপ্রয়োগের মাত্রা বৃদ্ধির একটা প্রক্রিয়া আছে সেটা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ভোটের দিন কিংবা পরে মব হলে সেনাবাহিনীর কী ভূমিকা থাকবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ইতঃপূর্বে দেখেছি যে বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে, মবের ইনসিডেন্ট আমরা দেখেছি। সরকার, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন এবং সব আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা করণীয় তা করতে বদ্ধপরিকর।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে বা কার্যক্রম না থাকার কারণে এই নির্বাচন থেকে বাহিরে আছে এবং দলটির অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপন করে আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বা ভার্চুয়াল জগতে দেখছি যে এই দলটির প থেকে ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে বা না যাওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক থ্রেড বা হুমকি দেয়া হচ্ছে। সে েেত্র সেনাবাহিনী কোনো থ্রেড পেয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে আমি আলোচনায় যাবো না। তবে যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতা প্রতিরোধের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীও সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।

আর মাত্র এক সপ্তাহের কম সময় ইলেকশনে, সেখানে এখনো মানুষের মাঝে একটা সংশয় রয়ে গেছে যে আসলে ইলেকশনটা কিভাবে হবে, কতটুকু এনভায়রনমেন্ট আসলে হয়েছে বা ভোট হবে কি না। এখানে কি আসলে সরকারের প থেকে কোনো ব্যর্থতা দেখছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই সংশয় দূর করার জন্যই কিন্তু সেনাবাহিনী প্রধান সব বিভাগে ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছেন এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনী যারা এই নির্বাচনের সাথে নিয়োজিত থাকবেন তাদের সাথে মতবিনিময় করেছেন। দুটো উদ্দেশ্য নিয়ে গিয়েছেন। একটা হচ্ছে তাদেরকে আস্থা দেয়া যে তাদের যেকোনো সহায়তা প্রদানের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুত আছে এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে জনগণকে আস্থা দেয়া এবং ওই বার্তাটা সুস্পষ্টভাবে দেয়া যে সব বাহিনী সমন্বিতভাবে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেয়ার জন্য প্রস্তুত।

নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকা অবস্থায় যদি ভোটারের আস্থা ক্ষুণœ হয় এবং ফলাফল নিয়ে যদি কোনো প্রশ্ন উঠে তবে সেনাবাহিনী যে মাঠে গণতান্ত্রিকভাবে নিরপে ছিল এটি তারা কিভাবে প্রমাণ করবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেনাপ্রধান পরিষ্কারভাবে একটি কথা বলে দিয়েছেন যে সম্পূর্ণ নিরপেভাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো। দেশের সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিঘেœ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং তার ভোটটা সে দিতে পারে এটা নিশ্চিত করা হবে আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।

একটি রাজনৈতিক দলের দুইজন শীর্ষ নেতার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে, যা চরম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এই হ্যাকারদের ব্যাপারে সেনাবাহিনীর আইটি সেকশন বা সেনাবাহিনী কোনো ভূমিকা রাখছেন কি না চিহ্নিত করার জন্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে আমরা যাতে এই আক্রমণের শিকার না হই সে প্রস্তুতি আমরা আমাদের নিয়েছি। আর এর বাইরে প্রত্যেকের যার যার জায়গা থেকে এই প্রস্তুতি তাকে নিতে হবে। বাট আমি আপনাকে আশ্বস্ত করতে পারি যে সেনাবাহিনী তার যে সব আইটি সাইট আছে সেগুলো যাতে হ্যাক না হয় সে ব্যাপারে যতটুকু প্রস্তুতি নেয়ার সেই প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি এবং নিচ্ছি।

নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে আপনাদের নিজস্ব কোনো থ্রেড অ্যানালাইসিস রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, থ্রেড অ্যাসেসমেন্ট অবশ্যই একটি সেনাবাহিনী তার কর্মপন্থায় প্রথম কাজ যেটা করে তা হচ্ছে থ্রেড অ্যাসেসমেন্ট। আমরা অবশ্যই এটা একটা থ্রেড অ্যাসেসমেন্ট করেছি এবং তদনুযায়ী আমাদের এই মোতায়েন পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নির্বাচনে এক লাখ সেনাবাহিনী সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগের নির্বাচনে কত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। আগের থেকে বাড়তি মোতায়েন করা হলে কেন করা হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের নির্বাচনগুলোতে আমরা সর্বোচ্চ ৪০-৪২ হাজার সদস্য মোতায়েন করেছি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে এবার এক লাখ সদস্য কেন মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যান্য নির্বাচন থেকে এবারের নির্বাচনে আমাদের মোতায়েনের পার্থক্য হচ্ছে এবার ভোট কেন্দ্রের আঙ্গিনা পর্যন্ত অনুমতি দেয়া হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোতে এই অনুমতি ছিল না।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের আগেই কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। আর যে কারণে গত ১০ জানুয়ারি আমাদের যে মোতায়েন সংখ্যা ছিল সেটা ৩৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে আমরা ৫০ হাজারে উন্নীত করেছি। পরবর্তীতে ২০ জানুয়ারি এক লাখ সেনা মোতায়ন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নৌবাহিনী পাঁচ হাজার এবং বিমান বাহিনী তিন হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়ন করেছে। বিজিবি পুলিশ-আনসারের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়নের যে দৃশ্যমান প্রভাব সেটা কিন্তু আপনারা (সাংবাদিক) দেখতে পাচ্ছেন এক দিকে অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা যেমন অনেক গুণ বেড়ে গেছে অন্য দিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত ১০ হাজার ১৫২টি অস্ত্র, দুই লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এবং দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।

নির্বাচনে কোনো দল বা কোনো গোষ্ঠী যদি ব্যালট দখল করতে যায় অথবা ভোট কেন্দ্র দখল করতে যায় সে েেত্র সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হবে? পাশাপাশি গত জুলাই বিপ্লবে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৩৩১টি অস্ত্র উধাও, পুলিশ বলছে তাদের সব অস্ত্র তারা পায়নি, এই অস্ত্রগুলো আগামী নির্বাচনের জন্য ঝুঁকি হিসেবে আপনারা দেখছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, আমরা অসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সর্বদা প্রস্তুত আছি। এ কারণেই এবার অন্যান্য বছরের তুলনায় আমরা সর্বাধিক সংখ্যক সেনা সদস্য মোতায়েন করেছি যাতে অতি দ্রুততম সময় এ ধরনের কোনো ইনসিডেন্ট আসলে সেটা আমরা প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারি। এখনো খোয়া যাওয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আমরা হারিয়ে যাওয়া অস্ত্রগুলোকে উদ্ধার করার জন্য অভিযান জারি রেখেছি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজব ও কবে সেনাবাহিনী আবার ক্যান্টনমেন্টে চলে যাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সোশ্যাল মিডিয়া শুধু না, এর সাথে যদি আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই যোগ করে দিই তা হলে তো এখন আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে যেকোনো একজনের চেহারা শুধু থাকলেই হলো যেকোনো কিছু তৈরি করা সম্ভব। সেটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্যই আমি আপনাদের (সাংবাদিক) কাছে সাহায্য চেয়েছি যে আপনারা যদি তাৎণিকভাবে যেকোনো একটা মিথ্যা বা অপতথ্যের প্রচারের আগেই যদি বস্তুনিষ্ঠ এবং তথ্যনির্ভর একটা সংবাদ আপনারা যদি প্রকাশ করেন মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় যেটা, সেখানে যদি এটা নিয়ে আসা যায় তা হলে এটা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হবে। আর আমরা কত দিন থাকবো নির্বাচনের পরে, এটা একদমই হচ্ছে সরকারের সিদ্ধান্ত। আজকে যে মোতায়েন হয়েছি এটা যেমন সরকারের সিদ্ধান্তে আমরা মোতায়ন হয়েছি, ঠিক একইভাবে আমরা কবে আমাদের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে আমরা ফিরে যাব সেটাও সরকারের সিদ্ধান্ত।