গাজার রক্তাক্ত পথে যখন মানবতা রুদ্ধশ্বাস, ঠিক তখনই আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে ভেসে এলো এক অবরুদ্ধ জাতির কণ্ঠস্বর। ইয়েমেনের প্রতিরোধ সংগঠন আনসারুল্লাহ’র সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহইয়া সারে ঘোষণা দিলেন, ‘গাজায় চলমান গণহত্যার কারণে ইয়েমেন এক গভীর ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্বের মুখোমুখি হয়েছে।’

ইসরাইল হায়োম, দ্য ইকোনমিস্ট, আস-সাওরা, আইএসএনএ, গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট, লন্ডন সেন্টার ফর মিডল ইস্ট স্টাডিজের বরাত দিয়ে ইরানের অন্যতম জনপ্রিয় দৈনিক হামশাহরি অনলাইন ও কায়হান জানিয়েছে, এই দায় থেকেই শুরু হলো নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি। ইয়াহইয়া সারে জানান, তারা ‘শত্রুকে ঘিরে ফেলার চতুর্থ ধাপ’-এ প্রবেশ করেছে। এবার তারা নিশানা করবে সেই সব বাণিজ্যজাহাজকে, যেগুলোর মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো অধিকৃত ফিলিস্তিনে, বিশেষ করে ইসরাইলের বন্দরে, কার্যক্রম চালায়।

নতুন যুদ্ধভূমি: লোহিত সাগর

ইয়েমেনের এই প্রতিরোধ এবার কেবল গাজার আকাশে থেমে নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে। আনসারুল্লাহ বাহিনী হুঁশিয়ার করেছে, কৌশলগত বাব আল-মানদাব প্রণালী যেকোনো মুহূর্তে আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বাকিল আল-ওয়াহবি, যিনি আনসারুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ আল-ওয়াহবি ব্রিগেডের কমান্ডার, সানা থেকে প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় পত্রিকা আস-সাওরা-তে বলেন, ‘আগামী সামরিক পদক্ষেপগুলো হবে ইসরাইল ও তার মিত্রদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাব আল-মানদাব প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি এক ধরনের বৈশ্বিক চাপে পরিণত হবে, যা গাজার ওপর চালানো অবরোধ এবং গণহত্যা বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।’

পরিণতি: শুধু যুদ্ধ নয়, বিশ্ববাণিজ্যই কাঁপছে

বাব আল-মানদাব প্রণালী হলো বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ, যার মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে দৈনিক প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়। গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সাগর পথে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে।

ইরানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম কায়হান ও হামশাহরি অনলাইন একযোগে জানিয়েছে, ইয়েমেনি হামলার কারণে বাব আল-মানদাব দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের পরিমাণ এক-ষষ্ঠাংশে নেমে এসেছে। অনেক ইউরোপীয় কোম্পানি এখন আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে জাহাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছে। এতে সময় বাড়ছে ২০ দিন, আর জ্বালানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে ৩৩ শতাংশ।

বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট এক বিশ্লেষণে লিখেছে, ‘ইয়েমেন ইউরোপের সামুদ্রিক শক্তির দাবি ভেঙে দিয়েছে। প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, ছোট অথচ দৃঢ় প্রতিরোধ কতটা বড় কৌশলগত প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।’

ইসরাইলি স্বীকারোক্তি: এ আর কেবল ভোরের যন্ত্রণার শব্দ নয়

ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা-বিষয়ক বিশ্লেষক এবং তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এয়াল জিসার ইসরাইল হায়োম-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে সরাসরি লিখেছেন, ‘ইয়েমেনি হামলা এখন আর নিছক বিরক্তিকর ঘটনা নয়, বরং তা ইসরাইলের জন্য প্রকৃত হুমকিতে পরিণত হয়েছে।’

তিনি স্বীকার করেন, ‘ইলাত বন্দরের কার্যক্রম প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। ইয়েমেনিদের হাতে থাকা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এখন এতটাই উন্নত যে তা ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিচ্ছে।’

এয়াল জিসার আরো সতর্ক করেন, ‘যদি ইসরাইল এই হুমকিকে হালকাভাবে নেয়, তবে ইয়েমেনিরা হামলা আরো জোরদার করবে। এমনকি ভবিষ্যতে বেসামরিক বিমান চলাচলও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যেতে পারে।’

প্রতিরোধের প্রকৃত অর্থ: অবরোধকারী নয়, বরং অবরুদ্ধরাই

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এই পর্বে ইয়েমেনের প্রতিরোধ শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের সংখ্যা দিয়ে নয়, কৌশল, লক্ষ্যভেদ, ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে আঘাত হানার ক্ষমতা দিয়ে বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে গেছে। এই ‘ডিটারেন্স’ এসেছে কোনো সামরিক বাজেট থেকে নয়, এসেছে এক অবরুদ্ধ জাতির বুক চিরে।

আজ যখন পশ্চিমা বিশ্ব বাধ্য হচ্ছে বিকল্প পথ- আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ বা উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ব্যবহার করতে, তখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে বাব আল-মানদাব আর কেবল এক সামুদ্রিক পথ নয়। এটি এখন নতুন ভূরাজনীতির প্রতীক। এটি ইয়েমেন আর সৌদি আরবের ছায়ায় ঢাকা পড়া দেশ নয়, বরং এক বিশ্বপর্যায়ের খেলোয়াড়। যারা প্রমাণ করে দিয়েছে, পথ বদলাতে শুধু শক্তি নয়, সংকল্প লাগে।

আকাশ, সমুদ্র, রাজনীতি- সব জায়গায় এখন চলছে কৌশলের লড়াই। আর এই লড়াইয়ের কেন্দ্রে ইয়েমেন দাঁড়িয়ে আছে এক নতুন মানচিত্রের কারিগর হয়ে।