কলকাতার প্রাণকেন্দ্র নিউ মার্কেটসংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে গভীর রাতে আগুন লেগে শিশুসহ অন্তত নয় বাংলাদেশী নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি নিছক একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, অগ্নিনিরাপত্তার গুরুতর ঘাটতি এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল দিক। ১৯ আগস্ট ভোররাতের এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ছয় থেকে আটজন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুই নারী ও এক শিশু রয়েছে। চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া এসব মানুষ পরবাসে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—যে মানুষগুলো উন্নত চিকিৎসার আশায় দেশের বাইরে গিয়েছিলেন, তাদের জীবনই শেষ হয়ে গেল একটি হোটেলের অগ্নি নিরাপত্তাহীনতায়। আগুনের তীব্রতা হয়তো সীমিত ছিল, কিন্তু ধোঁয়া দ্রুত পুরো ভবন গ্রাস করে। সরু পথ, পর্যাপ্ত বের হওয়ার ব্যবস্থা না থাকা, জানালাবিহীন বা দুর্বল বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা এবং অগ্নিনিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তোলে। প্রাথমিক তদন্তে এসি বিস্ফোরণ ও শর্টসার্কিটকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখা হলেও আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি।

এখানেই আমি প্রশ্ন তুলতে চাই যে, এটি কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো নাশকতা, অপরাধমূলক অবহেলা কিংবা পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনাও ছিল?

আমি কোনো প্রমাণ ছাড়া নাশকতার অভিযোগকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাই না। বরং ঠিক উল্টোটা বলছি—নাশকতার সম্ভাবনা থাকলে যেমন তা তদন্ত করতে হবে, তেমনি দুর্ঘটনা হলে দুর্ঘটনার কারণও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে হবে। আগুনের সূত্রপাত কোথায়, বৈদ্যুতিক সংযোগের অবস্থা কী ছিল, সিসিটিভি ফুটেজ কী বলছে, দরজা-জানালা ও জরুরি বহির্গমনপথ সচল ছিল কি না, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও অ্যালার্ম ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, হোটেলের অনুমোদন ও ফায়ার সেফটি সার্টিফিকেট ছিল কি না—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর জানা প্রয়োজন।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আগুন লাগার আগে হোটেলটির নিরাপত্তা পরিদর্শন হয়েছিল কি না এবং হয়ে থাকলে সেই পরিদর্শনের নথি কী বলে। কারণ কোনো ভবন যদি বছরের পর বছর নিরাপত্তা বিধি না মেনে ব্যবসা পরিচালনা করে থাকে, তাহলে শুধু হোটেল মালিক নয়—নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে।

ঘটনার ভয়াবহতা আরও বাড়িয়েছে ভবনটির চরিত্র। একই পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন তলায় একাধিক হোটেল বা গেস্টহাউস পরিচালিত হওয়ার তথ্য এসেছে। স্থানীয়ভাবে এসব আবাসিক স্থাপনায় বাংলাদেশী চিকিৎসাপ্রার্থীদের অবস্থানের কথাও উঠে এসেছে।

অতএব তদন্ত শুধু ‘কীভাবে আগুন লাগল’—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রশ্ন করতে হবে—কেন এত মানুষ বের হতে পারল না?

নিহতদের পরিবারগুলোর সামনে এখন সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা। স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে তাদের মোকাবেলা করতে হবে লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা, চিকিৎসা ব্যয়, আহতদের চিকিৎসা, যাতায়াত, পরিচয় শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের অনিশ্চয়তার নির্মমতা।

এখানে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব শুধু মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করে লাশ দেশে পাঠানো নয়। বরং যদি হোটেল কর্তৃপক্ষের অবহেলা, অগ্নিনিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন, ভবন ব্যবস্থাপনার ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো দায় প্রমাণিত হয়, তাহলে নিহত ও আহত প্রত্যেক বাংলাদেশী নাগরিকের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ আদায়ে রাষ্ট্রকে সক্রিয় হতে হবে।

সুতরাং বাংলাদেশ সরকারের উচিত কলকাতায় একটি আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা সেল গঠন করা, যাতে নিহত ও আহতদের পরিবার প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পায়। শুধু কাগজপত্রের কাজ করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না; ক্ষতিপূরণ দাবি, বীমা, চিকিৎসা ব্যয়, লাশ পরিবহন এবং প্রয়োজনে আদালতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও পরিবারগুলোকে সহযোগিতা করতে হবে।

এখানে আরেকটি বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নানা কারণে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ বিষয়টিকে অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে দেখেছে; ভারত জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং দুই দেশই সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা এই সম্পর্ককে নিঃসন্দেহে সংবেদনশীল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে কলকাতায় নয় বাংলাদেশীর মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ঘটনা।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী—যিনি দীর্ঘদিনের কঠোর রাজনৈতিক অবস্থান ও বাংলাদেশী অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে পরিচিত—তার সরকারের সময় এই ঘটনা ঘটেছে। তাই কোনো ধরনের রাজনৈতিক পূর্বধারণা দিয়ে ঘটনাটিকে বিচার করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি রাজনৈতিক পরিবেশের বাস্তবতাকে তদন্তের বাইরে রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

আমার বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার: নিহতরা বাংলাদেশী বলেই তাদের সঙ্গে কোনো বৈষম্য হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হওয়া উচিত; আবার বাংলাদেশী হওয়ার কারণেই ঘটনাটিকে নাশকতা হিসেবে ধরে নেওয়া যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি না।

ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গজুড়ে হোটেলগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনার কথা সামনে এসেছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে তারাপীঠের একটি হোটেল অগ্নিকাণ্ডেও বহু প্রাণহানি ঘটেছিল।

একই সপ্তাহে পরপর প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ড হলে প্রশাসনের উচিত এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি কাঠামোগত নিরাপত্তা সঙ্কেত হিসেবে দেখা।

বিশেষ করে যেসব হোটেলে বাংলাদেশী চিকিৎসাপ্রার্থীরা নিয়মিত থাকেন, সেসব প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা নিরাপত্তা অডিট করা প্রয়োজন। জরুরি বহির্গমনপথ, ফায়ার অ্যালার্ম, স্মোক ডিটেক্টর, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক তারের নিরাপত্তা, রান্নাঘর ও এসি ইউনিটের ঝুঁকি, ভবনের ধারণক্ষমতা এবং অতিথিদের জরুরি নির্দেশনা—সবকিছু নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।

এই ট্র্যাজেডির আরেকটি বেদনাদায়ক দিক হলো যে , নিহতদের অনেকেই চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যদি কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাত, তাহলে কি তাদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে হতো?

প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। এর ফলে দেশের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বেরিয়ে যায়। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়েও বড় বিষয় হলো মানুষের আস্থা হারানো।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে এসে আমাদের প্রশ্ন করতেই হবে—কেন এখনো জটিল চিকিৎসার জন্য মানুষকে দেশের বাইরে যেতে হয়? কেন সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনবল, বিশেষায়িত চিকিৎসা, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ঘাটতি থাকবে? কেন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা তৈরি করা যাবে না, যেখানে একজন সাধারণ মানুষও বিশ্বাস করতে পারেন—দেশেই তার চিকিৎসার সর্বোচ্চ চেষ্টা হবে? কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ড আমাদের সেই ব্যর্থতার কথাও মনে করিয়ে দিল।

নয়জন বাংলাদেশীর লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব। কিন্তু তার সঙ্গে তাদের পরিচয়, চিকিৎসা ইতিহাস, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং আইনি নথিপত্র সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে। আহতদের চিকিৎসা ও নিরাপদ প্রত্যাবর্তনও নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবারগুলো যেন ক্ষতিপূরণ পাওয়ার লড়াইয়ে একা না হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও সহায়তা কাঠামো গঠন করা প্রয়োজন। ভারতের তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে তথ্য বিনিময়, পোস্টমর্টেম ও ফরেনসিক রিপোর্ট সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, হোটেলের লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা নথি পরীক্ষা এবং দায় নির্ধারণ—সবকিছু স্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়া দরকার। এই তদন্তে বাংলাদেশকে শুধু দর্শক হয়ে থাকলে চলবে না।

এখানে আরেকটি লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো যে, বাংলাদেশ ও ভারত প্রতিবেশী। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কূটনৈতিক টানাপোড়েন থাকবে, সীমান্ত ও পানি থেকে শুরু করে প্রত্যর্পণ—বহু বিষয়ে মতবিরোধ থাকতে পারে। কিন্তু একজন বাংলাদেশী নাগরিক যখন ভারতের মাটিতে বিপদে পড়েন, তখন তার নাগরিক পরিচয় যেন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের কাছে পরাজিত না হয়। কলকাতার এই অগ্নিকাণ্ড তাই শুধু নয়টি পরিবারের কান্না নয়; এটি দুই রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতার পরীক্ষাও বটে।

সুতরাং আগুন কীভাবে লাগল—তার নিরপেক্ষ উত্তর চাই। কার গাফিলতিতে মানুষ মরল—তার জবাব চাই। নাশকতা হলে তার প্রমাণ ও বিচার চাই। অপরাধমূলক অবহেলা হলে দায়ীদের শাস্তি চাই। আহতদের পূর্ণ চিকিৎসা চাই। নিহতদের লাশ দ্রুত ও মর্যাদার সঙ্গে দেশে ফেরত চাই। আর নিহত ও আহতদের পরিবারকে ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ চাই।

পরিশেষে বলতে চাই, এই ঘটনাটি কেবল পত্রিকার পাতায় কয়েকদিনের খবরের শিরোনাম হয়ে মিলে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কলকাতা উপ-হাইকমিশনকে অবিলম্বে একটি বিশেষ সেল গঠন করে নিহতদের পরিবারের কাছে দ্রুত লাশ পৌঁছানোর কাজ শেষ করতে হবে। একই সাথে, আহতদের সুচিকিৎসা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুয়ায়ী হোটেল কর্তৃপক্ষ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর মামলা দায়ের করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যাতে এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো নাশকতামূলক বা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল কিনা তা সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতার সাথে খতিয়ে দেখা হয়, সে বিষয়ে বাংলাদেশকে শক্ত বার্তা দিতে হবে। আর নিজ ভূখণ্ডে আমাদের নীতি-নির্ধারকদের এই মর্মান্তিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশের ভেঙে পড়া চিকিৎসাব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করার সৎ উদ্যোগ নিতে হবে, যেন আর কোনো নাগরিককে চিকিৎসার খোঁজে ভীতি ও মৃত্যুর মুখে পরবাসে দিন কাটাতে না হয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ahabibhme@gmail.com