শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী জমানায় বিরোধী দল-মত নির্মূল করা হয়েছে। তার সরকার গুম খুন বিচারবহির্ভূত হত্যা থেকে শুরু করে মানবতাবিরোধী হেন অপরাধ নেই যা করেনি। সবশেষে পতনের আগে জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালীন পাখির মতো গুলি করে দেড় সহস্রাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে। আহত করে আরো ২০ হাজারের মতো মানুষকে।

ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত সরকারের অধীনে দেশী-বিদেশী চক্রান্তে ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। ক্ষমতা গ্রহণের বছরখানেক না যেতেই তারা বিরোধী মত, বিশেষ করে উদীয়মান রাজনৈতিক শক্তি জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূলের ষড়যন্ত্র করে। এ জন্য তারা একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগকে কাজে লাগায়। তাদের বিচারের উদ্যোগ নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আসলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেশের ইসলামী নেতৃত্বকে বিচারিক হত্যা করা হয়। কারণ, পুরো বিচারের প্রক্রিয়াই ছিল অস্বচ্ছ এবং আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের বাইরে।

অবশেষে একাত্তরের কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ থেকে খালাস পেয়েছেন জামায়াতের নেতা এ টি এম আজহারুল ইসলাম। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আজহারুল ইসলামের আপিল সর্বসম্মতিতে মঞ্জুর করেছেন আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগ আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় এবং মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে এর আগে আপিল বিভাগের দেয়া রায় বাতিল ঘোষণা করেছে।

আজহারুল ইসলামের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এই সুযোগ সৃষ্টির কৃতিত্ব জুলাই গণ-আন্দোলনের অকুতোভয় নেতৃত্বের। এ সুযোগ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।

বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশে শেখ হাসিনা জামায়াতকে নেতৃত্বশূন্য করতে দলটির শীর্ষ পাঁচ নেতাকে বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে হত্যা করেন। কারণ, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ নিঃসংশয়ে প্রমাণিত নয়। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দীন কাদের চৌধুরীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যে ভিন্নমত নিধনের ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয় তা দেশবাসী প্রথম থেকেই বুঝতে পারছিলেন। শেখ হাসিনার সরকার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে দায়ের করা একটি মিথ্যা মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেফতার করে। পরে তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেফতার দেখানো হয়।

শুধু তাই নয়, ২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১-এর একটি আদেশে জানা যায়, বিচারপতি নিজামুল হক ও প্রবাসী আইন বিশেষজ্ঞ আহমেদ জিয়াউদ্দিন স্কাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন এবং ই-মেলে চিঠি আদান-প্রদান করতেন, যা ছিল আইনের ঘোরতর লঙ্ঘন। যুক্তরাজ্যের সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট স্কাইপ ও ই-মেল কেলেঙ্কারির অডিও রেকর্ডসহ রিপোর্ট প্রকাশ করলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সেই সাথে সর্বোচ্চ আদালত প্রাঙ্গণ থেকে অপহৃত মাওলানা সাঈদীর সাফাই সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে পরে পাওয়া যায় ভারতের কারাগারে। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, আওয়ামী লীগের এ বিচারিক হত্যার সাথে ভারতও জড়িত ছিল।

প্রবাদ রয়েছে, অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে তাতে নিজেকেই পড়তে হয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়া আওয়ামী লীগ নেতারা এখন নিজেরাই তাদের গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের কাঠগড়ায়। তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ।

এ টি এম আজহারুল ইসলামের খালাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে, দেশে ন্যায়বিচারের ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে।