দেশের প্রশাসনের মূল কেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে টানা তিন দিন ধরে একরকম অচলাবস্থা চলছে। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইন সংশোধনের সুপারিশ প্রত্যাখ্যান চেয়ে বিক্ষোভ করছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে তারা সমবেত হচ্ছেন। এটিকে ‘নিবর্তনমূলক ও কালাকানুন’ বলে অভিহিত করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হচ্ছে।

এ বিক্ষোভ এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। গত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের জনআকাক্সক্ষার আলোকে একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতি তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। গত সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী অপশাসনে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আমূল সংস্কার সাধন করে দেশকে সুষ্ঠু ধারায় ফিরিয়ে নেয়াই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক কাজ। কিন্তু গত ১০ মাসের অভিজ্ঞতায় এটি স্পষ্ট, সংস্কারের কাজটি এত সহজ নয়; বরং অত্যন্ত দুরূহ। রাজনৈতিক অঙ্গনসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নানা দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে অচলাবস্থা সৃষ্টির আলামত এ সরকারের শুরু থেকে স্পষ্ট। এর পেছনে কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের ইন্ধন ছাড়াও দেশী-বিদেশী সংশ্লিষ্টতার কথা শোনা যায়।

এমন একটি সময়ে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতা সরকারের জন্য অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো উদ্যোগ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নে সরকারকে তাদের ওপর নির্ভর করতে হবে। তাই প্রশাসনকে আস্থায় রাখা জরুরি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, কারো অন্যায্য দাবি মেনে নিতে হবে। তার প্রতি আপস বা আত্মসমর্পণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চ অবস্থান অবশ্যই থাকতে হবে। আর প্রশাসনকে সরকারের অনুগত থাকতে হবে।

আমরা বিশ্বাস করতে চাই, দাবি আদায়ের নামে কেউ নতুন করে ১৯৯৬ সালের মতো জনতার মঞ্চ গড়ার দিকে যাচ্ছেন না। গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের ভাবমর্যাদা খুব বেশি সমুন্নত হয়নি। তুলনামূলক অদক্ষ এবং জনবান্ধব না হয়ে বরং সরকারের সহযোগী একটি প্রশাসন দেখছেন দেশের জনগণ। এই প্রশাসন রাতের ভোটসহ জনগণের অধিকার হরণের সব আয়োজনে স্বৈরাচারী সরকারকে সহায়তা দিয়েছে। এ অবস্থার অবসান দরকার। সঙ্গত কারণে দক্ষ ও যুগোপযোগী প্রশাসন গড়ে তোলার কোনো কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন জবাবদিহি। তাই দেখা যাচ্ছে, সরকারের নতুন সুপারিশে সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা আছে। অসদাচরণের বৈশিষ্ট্যগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে এবং কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আগে ও পরে পদ্ধতিগত প্রক্রিয়া অনুসরণের সুপারিশও আছে।

আন্দোলনরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবির কতটুকু যৌক্তিকতা রয়েছে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তাই বলে পুরো অধ্যাদেশ প্রত্যাহার ছাড়া কাজে যোগ না দেয়ার এমন দাবির অর্থ আগের ধারাবাহিকতা বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়া। এটি কাম্য হতে পারে না।

আন্দোলনরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সরকার, উভয়ের প্রতি আমাদের আহ্বান, দ্রুত আলোচনায় বসুন। খোলা মনে স্বচ্ছতার সাথে আলোচনা করে সমস্যার সুরাহা করুন। দেশ ও জাতিকে অসহায় করে দাবি আদায়ের যেমন যৌক্তিকতা নেই, তেমনি জোর করে কোনো বিধিবিধান কারো ওপর চাপিয়ে দেয়াও শুভবুদ্ধির কাজ নয়।