২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলটিকে নিষিদ্ধ করা উচিত কি না প্রশ্নটি দেশে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২৩ অক্টোবর ২০২৪-এ একটি উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটে। এ দিন ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়নে জড়িত থাকায় আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়। এতদসত্ত্বেও, আলোচনা যখন আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য নিষিদ্ধকরণের দিকে মোড় নেয়, তখন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দৃঢ় অবস্থান নিতে নারাজ বলে মনে হয়। এ অনীহার পেছনে বাইরের বিভিন্ন দেশের সরকারের বাহ্যিক চাপসহ আরো নানা কারণ রয়েছে। এ ছাড়া, এ দলগুলোর গৃহীত অবস্থান কোনো সুসঙ্গত বা নীতিগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেয়া হয়েছে বলে মনে হয়নি। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে প্রাথমিক যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে দলটির দীর্ঘ ইতিহাস এবং চারপাশে ব্যাপক সমর্থনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে; যেন শুধু এর আকার ও প্রভাব এটিকে জবাবদিহি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আইনগত বা নৈতিক ভিত্তির বিবেচনায় যেটি বিতর্কে অনুপস্থিত এই নিবন্ধে, সেই গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের আইনি ও নৈতিক ন্যায্যতার বিষয়টি আমরা পর্যালোচনা করব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের মতো প্রধান দেশগুলোসহ ইউরোপীয় কাউন্সিলের রাষ্ট্রগুলোর দেড় শতাধিক রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়। এ নিষেধাজ্ঞার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বহুত্ববাদী সমাজের মূল মূল্যবোধ রক্ষা করা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো স্বাধীনতা, আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা সাংবিধানিক নীতিগুলোর জন্য হুমকিস্বরূপ দলগুলো নিষিদ্ধ করতে পারে। এমন দলগুলোও নিষিদ্ধ করতে পারে যেগুলো সহিংসতা প্রচার করে, ঘৃণা ছড়ায় অথবা মানবাধিকার ক্ষুণ্ন করে। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অতি-ডানপন্থী চরমপন্থার উত্থান, রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার প্রচেষ্টা (বিচ্ছিন্নতা) এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার প্রভাবের মতো বিদেশী বা কর্তৃত্ববাদী শক্তির সাথে রাজনৈতিক সংযোগ। কিছু দল নিষিদ্ধ করা হয়েছে অপরাধ সংঘটনে নয়; বরং এগুলোর লক্ষ্য ও কর্মকে গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে দেখা হয়েছে বলে।
বোহদান বার্নাটস্কি তার ‘হোয়াই অ্যান্ড হোয়েন ডেমোক্র্যাসিস ব্যান পলিটিক্যাল পার্টিস’ (কেন এবং কখন গণতন্ত্র রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে) শীর্ষক প্রবন্ধে তিনটি প্রধান পদ্ধতির রূপরেখা তুলে ধরেছেন; যাকে ইউরোপীয় দেশগুলো একটি দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আমলে নেয়। এর মধ্যে প্রথমটি হলো লিবারেল মডেল, যে মডেলে অপরাধমূলক আচরণ প্রমাণিত হলে কেবল কোনো দলের ওপর নিষেধাজ্ঞার অনুমতি দেয়া হয়। দ্বিতীয়টি হলো প্রাতিষ্ঠানিক মডেল, যেখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা নাগরিকদের অধিকার হুমকির মুখে ফেলে এমন ক্রিয়াকলাপে দলকে নিষিদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়। সেই ক্রিয়াগুলো প্রযুক্তিগতভাবে অপরাধমূলক না হলেও সেটি করা যেতে পারে। সবশেষে হলো উগ্র গণতন্ত্র মডেল, এ মডেলে আরো কঠোর অবস্থান নেয়া হয়, যেখানে তারা কোনো অপরাধ করে থাকুক বা না থাকুক দলকে শুধু গণতন্ত্রবিরোধী ধারণা প্রচারে নিষিদ্ধ করার অনুমতি দেয়া হয়।
লিবারেল মডেল
লিবারেল বা উদার মডেল হলো রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নমনীয় এবং খোলা মনের পদ্ধতি। এ ব্যবস্থার অধীনে, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রায় যেকোনো লক্ষ্য অনুসরণ করার অনুমতি দেয়া হয়, এমনকি লক্ষ্য গণতান্ত্রিক বা সংবিধানবিরোধী হতে পারে সেটিও অনুসরণ করতে পারে, যতক্ষণ না দলগুলো আইন ভঙ্গ না করে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো মডেলটি অনুসরণ করে, যেখানে প্রাথমিক ফোকাস একটি দলের রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিবর্তে ব্যক্তিগত অপরাধমূলক আচরণের ওপর থাকে। উদারপন্থী মডেল রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার অনুমতি দেয়; যদি দলগুলোর সদস্যরা অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত না থাকে। এ ব্যবস্থা একটি পার্টিকে নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করার সবচেয়ে কঠিন কাঠামোর মধ্যে একটি করে তোলে এটিকে। কারণ এর জন্য প্রয়োজন পার্টির সদস্যদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট, প্রমাণিত ফৌজদারি অপরাধ।
আওয়ামী লীগের ভাগ্য বিবেচনায় উদার, প্রাতিষ্ঠানিক বা উগ্র, এ তিন পন্থার মধ্যে কোনটি গ্রহণ করা হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন অন্তর্বর্তী সরকারের। তিনটি পন্থার যেকোনো একটিতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে পারে। সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এ বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে অবস্থান না নিয়ে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্তটি বিদেশী শক্তির চাপের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়, যাদের স্বার্থ বাংলাদেশের কল্যাণ ও গণতান্ত্রিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। যদি এ বিদেশী সত্তার সেরকম ক্ষমতা থাকত তাহলে আওয়ামী লীগ এখনো ক্ষমতায় থাকত এবং অনেক নাগরিককে গোপন বন্দিশালায় (আয়নাঘর) বন্দী করা অব্যাহত থাকত। যদিও এটি সত্য যে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়েছে, আবার এটিও সমভাবে সত্য যে, এর নেতৃত্ব ও সমর্থকরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে সংঘটিত সবচেয়ে জঘন্য নৃশংসতার অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে
১৯৫৬ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা উদারনৈতিক মডেলের ঐতিহাসিক উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির সহিংস কর্মকাণ্ডের সাথে দলটি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত বলে প্রমাণিত হওয়ার পরে এ নিষেধাজ্ঞা আসে। দলটি ব্রিটিশ সামরিক ইউনিট, পুলিশ স্টেশন এবং অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছিল। এ নিষেধাজ্ঞার ভিত্তি ছিল দলটির বেআইনি কাজে সরাসরি জড়িত থাকা, রাজনৈতিক মতামত বা আদর্শ নয়।
এখন, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে উদারপন্থী মডেল প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে, দলটির নেতারা ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টের সহিংস ঘটনার সময় অপরাধ করার জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে কেবল দলটিকে নিষিদ্ধ করার বৈধ কারণ সৃষ্টি হতে পারে। যদি প্রমাণ দেখা যায়, আওয়ামী লীগের নেতা বা সদস্যরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে সহিংসতা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিলেন, তাহলে উদারপন্থী মডেল অনুসারে দলটিকে নিষিদ্ধ করা বৈধ হতে পারে।
তবে, সিদ্ধান্তটি নির্ভর করছে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনি ফলের ওপর, যা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এ ধরনের গুরুতর অপরাধে দোষী কি না তা নির্ধারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত। যদি ট্রাইব্যুনাল দলের নেতাদের মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে, তাহলে এটি সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর বিদ্যমান কাঠামোর অধীনে পার্টির ওপর নিষেধাজ্ঞা বিবেচনা করতে আইনি ভিত্তি দেবে।
প্রাতিষ্ঠানিক মডেল
প্রাতিষ্ঠানিক মডেল অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ করতে এমন কর্মের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়; যা রাষ্ট্র বা নাগরিকদের অধিকার হুমকির মুখে ফেলে। এমনকি যখন সেই কর্মগুলো ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা যায় না তখনো সেটি হতে পারে। পদ্ধতিটি হাঙ্গেরি, সেøাভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে প্রয়োগ করা হয়। এটি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করা, ক্ষমতা দখলের চেষ্টা, রাজনৈতিক সহিংসতায় লিপ্ত হওয়া অথবা মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো কর্মের জন্য রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার অনুমতি দেয়। এ মডেলের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নিষেধাজ্ঞার ন্যায্যতায় অপরাধমূলক কাজের প্রয়োজন হয় না। পরিবর্তে, এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা এবং নাগরিকদের স্বাধীনতার সুরক্ষার ওপর একটি দলের কর্মের প্রভাবকে বিবেচনা করে।
এ মডেলের কার্যকারিতার একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ ইউক্রেনে দেখা যায়, দেশটি ২০২২ সালে একাধিক দল নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে ১৭টি রাশিয়ানপন্থী দল, যাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অনুভূত হুমকির কারণে নিষিদ্ধ করা হয়। এ দলগুলোকে রাশিয়ান স্বার্থের সাথে সংযুক্ত বলে মনে করা হয়েছিল, যা ইউক্রেন তার আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে। এ দলগুলো নিষিদ্ধ করার ইউক্রেনীয় সরকারের সিদ্ধান্তটি অপরাধমূলক কার্যকলাপের দ্বারা চালিত হয়নি; বরং দলগুলোর কর্মকাণ্ডের দ্বারা দেশের নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন করা হয়েছে মর্মে যুক্তি দেখানো হয়।
আমরা যখন বাংলাদেশের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই, আওয়ামী লীগ বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং চুক্তি করেছে, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের প্রধান করপোরেশন আদানি থেকে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তিটি বাংলাদেশের চেয়ে দিল্লির স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। আলজাজিরার প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুসারে, এ চুক্তিগুলো ভারতের সমর্থন সুরক্ষিত করতে করা হয়েছিল। বিশেষ করে দু’টি বিতর্কিত নির্বাচনের পরে এসব চুক্তি করা হয় যা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে সন্দেহ উত্থাপন করেছিল। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনা এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাকে আশ্রয় দিয়ে ভারত আওয়ামী লীগের প্রতি নিজের প্রতিশ্রুতিকে সম্মান জানায়। আর, চুক্তিগুলো যে বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক নয়; বরং আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন নিশ্চিত করতে ভারতকে সুবিধা দিতে করা হয়েছে; সে বিষয় তুলে ধরে।
প্রাতিষ্ঠানিক মডেলের অধীনে, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করতে একটি রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সরাসরি ক্ষতি করার কারণ থাকতে হবে না। এমনকি রাজনৈতিক সহিংসতা বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে যথেষ্ট ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে, জাতিসঙ্ঘ ইতোমধ্যে জানিয়েছে, গত বছরের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে দলের সাথে জড়িত সহিংস উপাদানগুলো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত ছিল। নথিভুক্ত অপব্যবহার এবং আওয়ামী লীগের কীর্তি-কলাপ ঘিরে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে, এ মডেলের অধীনে দলটি নিষিদ্ধ করতে একটি বাধ্যবাধকতামূলক মামলা রয়েছে। বাংলাদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ ইতোমধ্যে গণতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত রাজনৈতিক দলগুলোর বিলুপ্তির জন্য আইনি ভিত্তি দিয়ে রেখেছে।
উগ্র গণতন্ত্রের মডেল
গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় উগ্র গণতন্ত্রের মডেল হলো সবচেয়ে কঠোর পদ্ধতি এবং এটি জার্মানি, তুরস্ক ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশে প্রয়োগ করা হয়। এ মডেলের অধীনে, রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধু এদের ধারণা বা রাজনৈতিক লক্ষ্যের ভিত্তিতে নিষিদ্ধ করা যেতে পারে, এমনকি যদি সহিংসতার আশ্রয় না নেয় তা হলেও। এ মডেলে দলগুলো বেআইনি কার্যকলাপে জড়িত থাকুক বা না থাকুক গণতন্ত্রের মূল নীতিগুলোকে হুমকি দেয় এমন যেকোনো দলকে প্রতিরোধ করার প্রতি ফোকাস করা হয়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে, যদি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন করেছে বা গণতান্ত্রিক নীতির পরিপন্থী কাজ করেছে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকার এ যুক্তির ভিত্তিতে নিষিদ্ধ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত দিতে পারে। তবে, বাংলাদেশে বর্তমানে এ উগ্র গণতন্ত্রের মডেলটি প্রয়োগ করতে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামোর অভাব রয়েছে। এটি সম্ভব করতে, নতুন আইন পাস করতে হবে; যেটি সরকারকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরাসরি হুমকি সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা প্রদান করে।
অতএব, আওয়ামী লীগের ভাগ্য বিবেচনায় উদার, প্রাতিষ্ঠানিক বা উগ্র, এ তিন পন্থার মধ্যে কোনটি গ্রহণ করা হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব এখন অন্তর্বর্তী সরকারের। তিনটি পন্থার যেকোনো একটিতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে পারে। সরকার এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এ বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে অবস্থান না নিয়ে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্তটি বিদেশী শক্তির চাপের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়, যাদের স্বার্থ বাংলাদেশের কল্যাণ ও গণতান্ত্রিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। যদি এ বিদেশী সত্তার সেরকম ক্ষমতা থাকত তাহলে আওয়ামী লীগ এখনো ক্ষমতায় থাকত এবং অনেক নাগরিককে গোপন বন্দিশালায় (আয়নাঘর) বন্দী করা অব্যাহত থাকত। যদিও এটি সত্য যে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি হয়েছে, আবার এটিও সমভাবে সত্য যে, এর নেতৃত্ব ও সমর্থকরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে সংঘটিত সবচেয়ে জঘন্য নৃশংসতার অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। দলটি এর নেতা ও সদস্যদের ছাত্র ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা থেকে বিরত রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে হলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিজের কর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। একই সাথে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে জাতির গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষায় দৃঢ় নীতিগত অবস্থান নিতে হবে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি