বিচারের আগে বিচার করে ফেলার একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি বাংলাদেশে রয়েছে। সেই বিচারে দোষী সাব্যস্ত করার ঘটনাই বেশি। সেটি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিতই করছে। গণমাধ্যমও একই কাজ করতে সিদ্ধহস্ত। কখনো কখনো কোনো কোনো আসামি বা মহলকে এমনভাবে তারা উপস্থাপন করে, বিচারের আগেই তারা জনমনে দোষী চিহ্নিত হয়ে যায়। অনেকের ক্ষেত্রে নানারকম আপত্তিকর বিশ্লেষণও হয়। এ রকম কর্মকাণ্ড বন্ধ করার বিষয়ে ২০১২ সালে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন বাংলাদেশের হাইকোর্ট। তার পরেও সেটি বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মব বা মিডিয়া ট্রায়াল একতরফা ঘায়েলের মতো। আক্রান্তরা ব্যথায় ভোগে। স্বার্থান্বেষীদের কাছে এটি বেশ আমোদের।

গত কিছু দিন ধরে এক ধরনের মিডিয়া ট্রায়ালে ভূগছে দেশের বৃহৎ দল বিএনপি। এ ব্যথার প্রকাশ ঘটিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এক-এগারোর মতো বিএনপিকে আবারো মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বলেছেন, নির্বাচনে জেতার জন্য বিএনপির যত বেশি সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তত বেশি বিএনপিকে মিডিয়া ট্রায়ালের মুখোমুখি করা হচ্ছে। তারেক রহমানের এ অভিযোগ গুরুতর। তিনি বলেন, আগামীতে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যেখানে দেশের বেশির ভাগ মানুষ বিএনপিকে সমর্থন করছেন তত বেশি মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করা হচ্ছে। সোমবার সকালেও বাংলাদেশের কয়েকটি পত্রিকায় কিছু ঘটনা দেখলাম। ঘটনা ঘটেছে একরকম পত্রিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে আরেক রকমভাবে। তার ভাষায় এক-এগারোর সময় যেভাবে বিএনপিকে মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করা হয়েছিল সেভাবেই নতুন করে তাদের মদদপুষ্ট মিডিয়া একইভাবে এ রকম একটি প্রেক্ষাপট তৈরির চেষ্টা করছে।

‘তারা’ বলতে ‘বিএনপিবিরোধী শক্তি’। রাজনৈতিকভাবে ‘বিএনপিবিরোধী’ আর আসন্ন নির্বাচন প্রশ্নে ‘বিএনপিবিরোধী’ এক নয়। ৫ আগস্ট বিবেচনায় তারা সমশক্তি। নির্বাচন সামনে রেখে এ শক্তিগুলোর মধ্যে এখন বেশ বিভাজন। আর বিএনপিকে যেকোনোভাবে ঘায়েল করার কাজে এখনো ক্রিয়াশীল আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র-সহযোগী-বেনিফিশিয়ারি শক্তি। তাদের প্রধান অবলম্বনই মিডিয়া। তাদের বাঘা বাঘা কিছু ব্যক্তি পালিয়েছেন বা গা-ঢাকা দিয়েছেন। হাতেগোনা জনাকয়েক পাকড়াও হয়েছেন। বাকিরা দম নিয়ে টিকে আছেন নানান ছল-বাহানা-চাতুরিতে। মাঝে মধ্যে সুযোগ মতো সূক্ষ্ম ট্রায়ালের কাজটি করে নিচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও ইন্টারনেটের প্রসার মিডিয়া ট্রায়াল প্রবণতাকে আরো প্রবল করেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে অপতথ্য, ভুলতথ্যসহ নানা অনুষঙ্গ। বলার অপেক্ষা রাখে নাÑ প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষ সবসময় প্রতিশোধ নিতে চায়। শত্রুকে যেকোনো মূল্যে পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন করতে চায়। যে কারণে হাতের কাছে মানুষ যা পায় তাই ব্যবহার করে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমও ব্যবহৃত হয়েছে বহুকাল থেকেই। গণমাধ্যম পরিসরে এই শব্দযুগলের ব্যবহার শুরু হয় ষাটের দশকে। তখন টেলিভিশন ছিল খুবই শক্তিশালী মাধ্যম। সাংবাদিকরাও সমাজে সম্মানিত ও প্রভাবশালী ছিলেন। একজন সাংবাদিকের প্রতিবেদন ও উপস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে জনমত গঠিত হতো।

মিডিয়া ট্রায়াল হলো সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের কাভারেজের ফল। যার মাধ্যমে কোনো বিচারিক আদালতের রায়ের আগেই একজন ব্যক্তিকে সম্ভাব্য দোষী আখ্যায়িত করে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করা হয়। এর শিকার হলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জীবনযাপন অনেক কঠিন হয়ে যায়। এ ধরনের বিচার উচ্ছৃঙ্খল মানসিকতাকে উৎসাহিত করে।

গণমাধ্যম নীতির ন্যূনতম মানদণ্ড হলো বিচারের আগে, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কাউকে কোনো নেতিবাচক অভিধায় অভিযুক্ত না করা। কিন্তু গণমাধ্যমে ট্রায়ালের কাজটি হয় কিছু শব্দ-বাক্যে স্টোরির মাধ্যমে। একে অভিযুক্ত বা দোষারোপ বলার অবস্থা থাকে না। গণমাধ্যম দল বা মহলকে নিয়ে এমনভাবে বয়ান তৈরি করে যাকে দোষারোপ বলার সুযোগ থাকে না। ঠিক ট্রায়ালও বলা যায় না। কিন্তু বাস্তবে ট্রায়ালের চেয়েও বেশি। দেশে এখন যার একটি পরম্পরা চলছে। নেতিবাচক থেকে রক্ষা পেতে প্রথমেই প্রয়োজন গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সীমারেখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা। বিচারিক প্রক্রিয়া ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা, স্বতন্ত্র। বিচারিক প্রক্রিয়ায় মিডিয়ার খবরের বান বিশ্লেষণের কোনো প্রভাব থাকা উচিত নয়। যদিও সংবাদমাধ্যমের নানাভাবে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকে। আবার সাংবাদিকতা ও বস্তুনিষ্ঠতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় কিছু গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠতার বাইরে গিয়ে একটি তথ্যকে কতটা চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপন করা যায় সেদিকে বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে। গল্প-উপন্যাস বা অন্যান্য বিনোদনধর্মী লেখার মধ্যে কাল্পনিক কিছু যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতায় তা চলে না। বাস্তবটা বড় নির্মম। সেই নির্মমতার শিকার হয়েই মিডিয়া ট্রায়ালের যন্ত্রণার কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

সম্প্রতি বিএনপির ‘অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট’দের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতীতে বিএনপির অবদানের কথা উল্লেখ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিএনপি যতবারই সরকার পরিচালনা করেছে, ততবারই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, কৃষি এবং শিল্পে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। দল হিসেবে একমাত্র বিএনপিই ভবিষ্যতে সরকারে গিয়ে কী করবে সে রোডম্যাপ (পথনকশা) দিয়েছে, আর কেউ কি তা দিয়েছে? বিএনপি দুই বছর আগেই সংস্কারের রূপরেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান আরো বলেন, আপনারা (অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট) এগুলো যুক্তিতর্ক দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরবেন। মানুষের কাছে এসব নিয়ে যেতে হবে। আপনারা যুক্তিতর্ক দিয়ে তরুণ ভোটারসহ ভোটারদের আগ্রহী করতে বিএনপির ৩১ দফা তুলে ধরবেন এবং বিএনপির পক্ষে জনমত গড়ে তুলবেন। অতীতেও আপনারা করেছেন, সামনেও আপনাদেরই করতে হবে। আপনারাই সুন্দর করে করতে পারবেন।

অথচ নির্বাচন-সংস্কারসহ আরো কতক বিষয়ে বিএনপিকে নিয়ে কিছু দলের মাঝে এলার্জি লক্ষ করা যায়। পর্বতসমান অপকর্মের অনিবার্য জেরে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বিতাড়নের পর দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল এখন বিএনপি। রাজনীতি ও ভোটের মাঠে অন্যদের অবস্থান বিএনপির কাছাকাছি নয়। সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপি আগামীতে সরকার গঠন করবে। আর তাই, বিএনপিকে দেশবাসীর কাছে ভিলেন প্রমাণ করা কোনো কোনো দলের জন্য জরুরি। তাদের সাথে শেখ হাসিনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা গণমাধ্যমগুলোর একাট্টা হওয়া স্বাভাবিক। তাদের কারো কারো জনগণের সামনে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের মতোই একটি খারাপ দল প্রমাণ করতে হচ্ছে। অপপ্রচার-প্রোপাগান্ডার সাথে তিলকে তাল বানিয়ে বিএনপিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একটি মিশন তারা নিয়েছে। আজকের প্রজন্ম যাদের বয়স বিশের কোঠায় তাদের বেশির ভাগই জানে না, এক-এগারোর সরকারের সময়ে বিএনপির বিরুদ্ধে কি-না হয়েছিল। কিভাবে নিয়মিত চরিত্র হনন করা হয়েছিল তারেক রহমানের।

সেই সময়ে বিএনপির মধ্যম সারির কিছু নেতাকে টিআই সেলে নিয়ে নির্যাতন করে, দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তাদের লিখিত চোথায় স্বাক্ষর নিয়ে, সেসব চোথা আবার মিডিয়ায় সরবরাহ করা হতো। বড় বড় পত্রিকায় সেই সব চোথা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে ছাপা হতো। তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সেই অপপ্রচারের একটিও বিগত সরকার প্রমাণ করতে পারেনি। ট্র্যাজেডি হচ্ছে, বিএনপি কখনো মিডিয়াকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। কখনো বিএনপির নিজেদের লোককে মিডিয়াতে স্পেস করে দেয়নি। হাসিনা অনুগত সাংবাদিকদেরই প্রায়োরিটি দিয়েছে। রাজউকের প্লট দিয়ে, তাদের তদবির, সুপারিশ শুনেছে সব সময়। ভেবেছে, তারা হয়তো, অসম্ভব সময়ে বিএনপির পক্ষে দাঁড়াবে। সেটি পরে হাড়ে হাড়ে টের পেলেও উপলব্ধিতে কতটুকু এসেছে এ প্রশ্ন রয়েই গেছে। তারেক রহমান যখন দলটির বিরুদ্ধে আবার মিডিয়া ট্রায়ালের লক্ষণ দেখছেন, এবার একটি বিহিত বা ফয়সালা আসতেও পারে।

সেই প্রত্যাশার সমান্তরালে এ কথাও সত্য, মিডিয়া ক্ষেত্রে বিএনপি পুরোপুরি ব্যর্থ বলে একটি সমালোচনা আছে। দলের কেউ কেউ ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে বলে থাকেন, বিএনপি মিডিয়ার মর্মটা কখনোই বুঝতে পারেনি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মিডিয়া যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এর আন্দাজটা ভালো বুঝে আওয়ামী লীগ। বর্তমানে বিএনপির একটি নিজস্ব মিডিয়া সেল থাকার পরও মিডিয়াতে বিএনপিবিরোধীরা প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে, তার কাউন্টার হিসেবে মিডিয়া সেলের কর্মযজ্ঞ দৃশ্যমান নয়।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

rintu108@gmail.com