বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত। শুধু তাই নয়, এটি বাংলাদেশের চারদিকে ঘিরে আছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকেও বাংলাদেশকে কুক্ষিগত করে রেখেছে। এটি দুই দেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের স্বাভাবিক পরিণতি নয়; বরং ভারতীয় আধিপত্যবাদ এর কারণ। বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তায় ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ হলেও ভারতীয় আধিপত্য কখনো মেনে নেননি। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল সবসময় ভারতের অধীনতামূলক নীতি অনুসরণ করেছে। এমনকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিমালা পর্যন্ত নিয়েছে ভারতের অনুকূলে। স্বৈরতান্ত্রিক দলটির দমননীতিতে বাংলাদেশের মানুষ ভারতীয়করণের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেননি। অথচ দলটির বিগত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বলে আদৌ কিছু ছিল কি-না সেটিই বড় প্রশ্ন।

স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর এখন ভারতের বন্ধুত্বের নতুন মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। মানুষ তাদের চিন্তা ও অনুভূতি মুক্তভাবে উচ্চারণ করতে পারছেন। এর প্রতিফলন দেখা গেল গত শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে।

গবেষণা সংস্থা নেক্সাস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিসের (এনডিজে) উদ্যোগে জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা মূলত ভারতকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি মূল হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তারা বলেন, ভারতের আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তি পেতে হলে দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে এমন নিরাপত্তানীতি প্রণয়ন করতে হবে। পাশাপাশি ভারতের বিকল্প বন্ধুরাষ্ট্র অনুসন্ধানও জরুরি। তারা বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারত সাহায্য করে আমাদের প্রতি বন্ধুত্বের কারণে নয়; বরং পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন ছিল মূল লক্ষ্য।

এখন বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় স্বাধীনভাবে নিরাপত্তানীতি গ্রহণের তাকিদ অনুভূত হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ নীতিতে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিদেশী প্রভাবমুক্ত রাখা, সশস্ত্র বাহিনীর জাতীয় আনুগত্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া।

সমস্যা হলো, ভারতপন্থী দলের পতন হলেও আমাদের সরকার, প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনীসহ সমাজের সর্বস্তরে তাদের চেতনাধারীরা রয়ে গেছে। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরও এদের অবস্থান নাড়ানো যায়নি। নতুন বাংলাদেশের যে স্বপ্নে মানুষ উজ্জীবিত হয়েছিলেন তা ফিকে হয়ে এসেছে গত ১০ মাসে। এ পরিস্থিতিতে আশান্বিত হওয়ার জায়গা শুধু এটুকু যে, মানুষ তাদের উপলব্ধির পক্ষে কথা বলতে পারছেন। শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে পারছেন। জনমনে এর একটি কার্যকর প্রভাব নিশ্চয় পড়বে। সামনের নির্বাচনে যদি এ প্রভাবের প্রতিফলন ঘটে তা হলে একটি ইতিবাচক অগ্রগতির সম্ভাবনা আছে। তেমনটি ঘটলে একটি স্বাবলম্বী ও নিরাপদ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার সম্ভাবনা যেমন উন্মুক্ত হবে, তেমনি দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিদেশী প্রভাবমুক্ত করা, সশস্ত্র বাহিনীর জাতীয় আনুগত্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি স্বাধীন জাতীয় নিরাপত্তানীতি গ্রহণ করা সম্ভব হতে পারে।

সন্দেহ নেই, সাম্প্রতিক সময়ে ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ এবং সন্নিহিত অঞ্চল খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে অনেকাংশে। কিন্তু নিরাপত্তার দিক থেকে বাংলাদেশ একরকম অরক্ষিত বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিতে যে প্রস্তুতি নেয়া দরকার সেই অর্থনৈতিক সঙ্গতি আমাদের নেই। রাজনৈতিক দৃঢ়তাও দুর্বল। নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতি ছাড়াও ভারতের ইশারায় সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তিও এর অন্যতম কারণ।

এ অবস্থায় জনগণকে শত্রু-মিত্র চিনিয়ে দেয়ার দায়িত্ব সচেতন দেশপ্রেমিক রাজনীতিকদের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিটি ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদেরও। গবেষণা সংস্থা এনডিজের সেমিনার সে দায়িত্বই পালন করেছে।