চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দেড় দশকের অপশাসন অবসানে দেশবাসীর বুকের ওপর থেকে জগদ্দল পাথর অপসারিত হয়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী সবাই মনে করেছিলেন, পতিত স্বৈরাচার ও তার দোসররা আর কখনো মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। কিন্তু ফ্যাসিবাদবিরোধী পক্ষগুলোর পারস্পরিক অনৈক্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির কর্মসূচিতে গোপালগঞ্জে হামলা চালানোর দুঃসাহস দেখিয়েছে।

পয়লা জুলাই থেকে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করছে এনসিপি। এর মধ্যে দেশের কয়েকটি জেলায় দলটি কর্মসূচি পালন করে। মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত বুধবার গোপালগঞ্জে পদযাত্রার দিন ধার্য ছিল। মঙ্গলবার কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের স্থানীয় সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উভয়পক্ষ ব্যাপক প্রচারণা চালায়।

এনসিপির পদযাত্রায় ফ্যাসিবাদী শক্তি হামলা চালালে গত বুধবার গোপালগঞ্জ শহর রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতে গেলে সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়। হামলাকারীরা গত ১৬ জুলাই সকাল থেকে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ইউএনওর গাড়িতে হামলা, এনসিপির সমাবেশ মঞ্চে আগুন, ভাঙচুর, বোমা বিস্ফোরণ এবং পরে পদযাত্রায় অংশ নেয়া নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ করে। হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সেনাবাহিনীকেও মাঠে নামতে হয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সাথে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) চার প্লাটুন সদস্য যোগ দেন। বিকেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে গণমাধ্যমের খবর, এনসিপির সমাবেশ শেষ হওয়ার সাথে সাথে একদল লোক লাঠিসোটা নিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের ঘিরে হামলা চালায়। তারা চারদিক থেকে এনসিপির নেতাকর্মী ও পুলিশের গাড়ি আটকে দেয়। এ সময় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ, সাউন্ড গ্রেনেড ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় এনসিপির নেতাকর্মীরা ভিন্ন পথে ঘটনাস্থল ছাড়েন।

এখন প্রশ্ন হলো, বছর না ঘুরতেই পতিত স্বৈরাচারের দোসররা কিভাবে গোপালগঞ্জে এমন ঔদ্ধত্য দেখানোর দুঃসাহস পেল? নিঃসন্দেহে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর অনৈক্য এজন্য দায়ী। ৫ আগস্টের আগের ঐক্য তারা ধরে রাখতে পারেনি। স্বার্থের দ্ব›েদ্ব জড়িয়ে ঐক্য অনেকটাই নষ্ট করেছে। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে দ্ব›দ্ব শত্রুতায় রূপ নেয়। অন্যদিকে, পরাজিত শক্তি যে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে, সে বিষয়ে সরকার কতটা সজাগ তা স্পষ্ট নয়। কারণ, গত মঙ্গলবার এনসিপি গোপালগঞ্জে দলীয় কর্মসূচির ঘোষণা দেয়ার পরই প্রতিক্রিয়া দেখায় স্বৈরাচারের দোসররা। তারা এ কর্মসূচিতে বাধা দিতে পারে, এই বিষয়টি সরকারের আমলে নেয়া উচিত ছিল। তা না নেয়ায় আওয়ামী অপশক্তি গোপালগঞ্জে হামলার সুযোগ পেয়েছে।

গোপালগঞ্জে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, এর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আগামী দিনগুলোতে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে সরকারের এ মুহূর্তে করণীয় হলো, গোপালগঞ্জে এনসিপির নেতাকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলাকারী দুষ্কৃতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা।