মানুষের জীবনমান উন্নয়নের সাথে সাথে বাড়ছে গ্যাসের চাহিদা। পাইপলাইনে সরবরাহ করার পাশাপাশি সিলিন্ডার গ্যাসের ব্যবহারও বেড়েছে। গ্যাসের ব্যবহার এমনভাবে বাড়ছে, এতে করে দিন দিন গ্রাম আর শহর একাকার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনা, গ্যাসের সংযোগ লাইনের ত্রুটি ও ব্যবহারকারীদের অসাবধানতায় সারা দেশে বাড়ছে গ্যাসের বিস্ফোরণ। এতে মানুষ অগ্নিদগ্ধ হচ্ছেন। মারা যাচ্ছেন। বিপুল সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে।

দুঃখজনক হলো- বড় ধরনের গ্যাস বিস্ফোরণের পর কিছু দিন জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, সংস্থার কমিটি হয়, সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে দুর্ঘটনা এড়াতে কিছু সুপারিশমালাও প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সেগুলো কখনো বাস্তবায়ন হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। কাগজে-কলমে ফাইলবন্দী থাকে সব সুপারিশ। ফলে গ্যাস দুর্ঘটনা এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

নয়া দিগন্তে গতকাল রোববার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সারা দেশে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৭০৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ৮৮টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে, গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজে সারা দেশে ৪৬৫টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে।

গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনাগুলো দু’ভাবে হচ্ছে। একটি- বাসাবাড়ি ও রেস্টুরেন্টে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে গিয়ে। অন্যটি, পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহে সমস্যা থেকে।

গত বছর ফেব্রুয়ারির শেষে বেইলি রোডের একটি রেস্টুরেন্টে গ্যাস বিস্ফোরণ ছিল ভয়াবহ। এতে ৪৪ জন নিহত ও আহত হন অর্ধশত।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো: শাহজাহান শিকদার জানান, অসতর্কতাবসত রান্না করায় বেশি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। গ্যাসজনিত অগ্নিদুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে তিনি পরামর্শ দেন, যতক্ষণ পর্যন্ত রান্না চলবে ততক্ষণ পাশে থাকতে হবে। চুলা জ্বালিয়ে দূরে কোথাও যাওয়া যাবে না। অনুমোদিত ডিস্ট্রিবিউটর থেকে মানসম্পন্ন সিলিন্ডার কিনতে হবে। নিম্নমানের বা মরিচা ধরা সিলিন্ডার ক্রয় করা যাবে না।

সত্যি বলতে, বাসাবাড়ি ও রেস্টুরেন্টে সিলিন্ডার গ্যাস নিরাপদে ব্যবহার করতে ব্যবহারকারীদের ব্যবহারবিধি জানাতে হবে। এ জন্য সচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। এটি করতে হবে সিলিন্ডার ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর। সেই সাথে কোম্পানিগুলোর মানসম্পন্ন সিলিন্ডার বিক্রিতে সরকারের তদারকি থাকা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, পাইপলাইনগুলোর সমস্যায়ও গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটছে। ২০২১ সালে মগবাজারে এমন একটি দুর্ঘটনা ছিল ভয়াবহ। এতে ছয়জন নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক। লক্ষণীয়, গ্যাস সঞ্চালন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কেবল দুর্ঘটনা ঘটলে টনক নড়ে, এর আগে নয়। কিন্তু এমনটি কাম্য নয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তিতাসের অনেক পাইপলাইন পুরোনো হয়ে গেছে। যার কারণে লিকেজের ঘটনা ঘটছে। এসব লিকেজ তাৎক্ষণিক মেরামত করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে যাতে এ সমস্যা না থাকে সে জন্য পুরনো পাইপলাইন বদলে ফেলার উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

দিন যত যাচ্ছে, মানুষের নিরাপত্তার দিকটি তত বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষকে দায়িত্বশীল ও সাবধান হতে হবে।