জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপনীত হলে মানুষকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) সেবা দেয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে যদি সেই সেবা পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে থাকে তাহলে গুরুতর অসুস্থ সাধারণ মানুষ অসহায় হন। বাড়তি অর্থ খরচ করে বেসরকারি হাসপাতালে তাদের সেবা নিতে হয়।
একটি সহযোগী জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোকবল সঙ্কটের কারণে ঢাকাসহ সারা দেশের বড় ১৪টি সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা বন্ধ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় শ্বাসকষ্টের রোগী বেড়ে যাওয়ায় কোভিড-১৯ এমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের অধীনে ৪৮ জেলায় সরকারি হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ২৩ জেলায় আইসিইউ সেবা চালু হয়েছিল। প্রকল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লোকবল সঙ্কটের কারণে ১৪টি হাসপাতালের আইসিইউ সেবা বন্ধ রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা: শেখ ছাইদুল হক বলেছেন, আইসিইউ পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল প্রয়োজন। জনবল না থাকায় কোভিড-১৯ এমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের আওতায় কিছু চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান দিয়ে এসব আইসিইউ এতদিন সচল রাখা হয়েছিল। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এখন চাকরি নেই। এসব আইসিইউ সচল করতে নতুন প্রকল্প নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত আইসিইউগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে সরকারের এমন সঙ্কট তৈরি করার কারণ কি বোঝা মুশকিল। আইসিইউ সেবা যেকোনো সময় যে কারো প্রয়োজন হতে পারে। একটি প্রকল্প শেষ হলে সেই প্রকল্পের অধীনে সেবা পাওয়ার পথ কি তবে বন্ধ রাখতে হবে? নাকি সেবার দ্বার কিভাবে খোলা রাখা যায় সে বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার? ঢাকাসহ সারা দেশের যে ১৪টি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা বন্ধ সেগুলো কখন চালু হবে- সে বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য নেই। একই সাথে এসব আইসিইউয়ের যন্ত্রপাতি যে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে সে বিষয়ও সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ মোতাবেক এসডিজি-৩ (সর্বজনীন স্বাস্থ্য কাভারেজ) অর্জনের জন্য প্রতি ১০ হাজার জনগণের জন্য ২০২৫ সালে ৩১.৫ জন এবং ২০৩০ সালে ৪৪.৫ জন সেবা প্রদানকারী থাকার কথা। অথচ বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজারে কর্মরত আছে ১১.৭০ জন।
স্বাস্থ্য খাতের প্রয়োজনীয় দক্ষ লোকবলের অভাবে দেশের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন- তা হতে পারে না। বিত্তশালীরা চাইলেই বাড়তি অর্থ দিয়ে দেশে বেসরকারি চিকিৎসাসেবা নিতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তা পারেন না। কষ্টটা তাই সাধারণ মানুষকেই পোহাতে হয়। স্বাস্থ্য খাতের সঙ্কটের শেষ নেই। মানুষকে সুস্থ রাখার কাজে নিয়োজিত স্বাস্থ্য খাত যেন নিজেই অসুস্থ। স্বাস্থ্যের প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের সঙ্কট দূর করতে না পারলে স্বাস্থ্যসেবা নিতে মানুষের বিদেশমুখিতার অবসান হবে না।
আমরা মনে করি, দেশের ১৪টি সরকারি হাসপাতালে বিকল্প উপায়ে কিভাবে আইসিইউ সেবা চালু করা যায়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে।