মানুষ হত্যা ক্ষমার অযোগ্য একটি ফৌজদারি অপরাধ। সামাজিক শৃঙ্খলা ধরে রাখতে রাষ্ট্র ও সমাজে এই অপরাধ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সবসময় তৎপর থাকতে হয়। যখন এ নিয়ন্ত্রণে শৈথিল্য আসে তখন মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় ঘাটতি দেখা দেয়। আমাদের বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় এ লক্ষণ লক্ষণীয় মাত্রায় উপস্থিত। দেশে বিগত কয়েক বছর ধরে অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা বেড়ে যাওয়া এর ইঙ্গিত বহন করে।

নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে অতি তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে হত্যার ঘটনা যেন সাধারণ বিষয়ে রূপ নিয়েছে। তুচ্ছ কারণে একজন আরেকজনকে হত্যা করতেও দ্বিধা করছে না। উদ্বেগজনক হলো রাজধানীর কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতিদিন খুনের ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীতে ১৩৯টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৫৭টি রাজনৈতিক কারণে। বাকিগুলো পারিবারিক কলহ, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, অর্থনৈতিক লেনদেন ও তুচ্ছ ঘটনার দ্বন্দ্বের জেরে। পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, রাজধানীতে হত্যার ঘটনার ৪০ শতাংশের বেশি ঘটছে পারিবারিক কলহে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে হত্যার সংখ্যা বেড়েছে। বছরের প্রথম চার মাসে এক হাজার ২৪৬টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি আর এপ্রিল মানে ৩৩৬টি ঘটনা ঘটেছে।

আমাদের সমাজে তরুণদের মধ্যে বর্তমানে আমিত্বের প্রকাশ বেশ প্রকট। আধিপত্য বিস্তার বা ছোট কারণে হত্যার মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা। এখানে কারণের চেয়ে অহমিকার প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। আবার বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতাও অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার পেছনে কাজ করছে। এ ধারণাগুলো সাম্প্রতিক সময়ে বেশি অপরাধ সংঘটনে প্রভাব ফেলছে। সেই সাথে উত্তেজিত জনতার নামে ইদানীং বহু অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। যেখানে বিভিন্নভাবে ছাড় পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা। ফলে হত্যার মতো ভয়াবহ অপরাধ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, হত্যার পেছনে ক্রাইম সিন ও এ জাতীয় সিরিয়াল দেখা, সামাজিক বন্ধন ও সহমর্মিতা কমে যাওয়া, একে অপরকে ছাড় দেয়ার প্রবণতা হ্রাস, প্রযুক্তিতে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকে পড়াসহ বিভিন্ন কারণ কাজ করছে। এ কারণে ভবিষ্যতে নৃশংসতা আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। তাদের মতে, কোনো রাষ্ট্র বা সমাজে ছোট-বড় কারণে অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো আইনশৃঙ্খলা-ব্যবস্থার দুর্বলতা।

আমরা মনে করি, পারিবারিক-সামাজিক কারণে ঘটা খুনের মতো নৃশংস ঘটনা কমিয়ে আনতে হলে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে পারস্পরিক বন্ধন দৃঢ় করা এবং সহাবস্থানের মানসিকতা গড়ে তোলা অপরিহার্য। অন্যথায় মানুষ আরো ব্যক্তিকেন্দ্রিক হলে নৃশংসতা বেড়ে যেতে পারে। ভয়াবহ এই অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে বিচার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হলে নৃশংস ঘটনাগুলো কমে আসবে আশা করা যায়। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত এসব ঘটনায় যারা জড়িত তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা।