জাতীয় বাজেট নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচল সব সময়ই থাকে। এবার সেটি আরও বেশি। কারণ, বিএনপির নতুন সরকার এমন সময় প্রথম বাজেট দিতে যাচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি কার্যত ফোকলা করে গেছে ২০২৪-এর পতিত সরকার। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির ধস ঠেকানোর চেষ্টা করলেও যথেষ্ট সময় পায়নি। এখন ধস বন্ধ করে অর্থনীতি টেনে তোলার পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে নির্বাচিত সরকারের ওপর।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের পক্ষ থেকে প্রতি বছরের মতো নানা মতামত ও সুপারিশ এসেছে। তবে সাধারণ মানুষ আশা করে, বিএনপি সরকার সত্যিকার অর্থেই একটি গণমুখী তথা জনগণের প্রকৃত কল্যাণের বাজেট দিতে পারে কি না। তার চেয়েও বড় কথা, এমন কোনো নতুন ধারণার উদ্ভাবন করতে পারে কি না যা, অর্থনীতিতে বড় ধরনের পালাবদলের সূচনা করবে।
গতকাল নয়া দিগন্তের এক রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, বাজেটে একটি নতুন চমক ঠিকই আসছে। সরকার ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ নামে একটি নতুন ধারণা যোগ করতে যাচ্ছে, যেটির সফল বাস্তবায়নে অর্থনীতিতে সত্যিই বড় সুফল পাওয়া সম্ভব। ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র লক্ষ্য হলো তরুণদের মেধা, উদ্ভাবন এবং ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্পকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা। তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, চলচ্চিত্র, গেমিং, ডিজাইন এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক শিল্প নিয়ে এই নতুন অর্থনৈতিক কৌশল সাজানো হচ্ছে।
এবারের বাজেট হতে পারে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। এতে সৃজনশীল অর্থনীতির খাতে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। সৃজনশীল পণ্য ও ডিজিটাল সেবা বিদেশে রফতানির বিপরীতে বিশেষ নগদ প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সৃজনশীল কারিকুলাম তৈরি এবং শিল্প ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
বিশ্বে সৃজনশীল অর্থনীতি খাতে বার্ষিক আয় বর্তমানে দুই ট্রিলিয়ন (২ লাখ কোটি) মার্কিন ডলারের বেশি এবং এতে বিশ্বজুড়ে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই খাত বিভিন্ন দেশের জিডিপিতে বিপুল অবদান রাখছে। ফিলিপাইনের মতো দেশের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ৭.৩৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ার ৭.২৮ শতাংশ।
আমাদের ধারণা, ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার সরকার ভ্যাট বা মূসক চালুর মাধ্যমে পুরো দেশের অর্থনীতির যেমন পুরো খোলনলচে পাল্টে দিয়েছিল, বর্তমান সৃজনশীল অর্থনীতির ধারণাও হতে পারে তেমনি কার্যকর হাতিয়ার। এর সাথে যোগ হবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিল্প ইত্যাদি অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার উদ্যোগ। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বাজেটের মূলধারার বাইরে থাকা কুটির শিল্প খাত অর্থাৎ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনা হবে।
সৃজনশীল শিল্প এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বাংলাদেশেও তেমনটা হওয়া সম্ভব। কারণ, দেশের তরুণরা এরই মধ্যে ফ্রিল্যান্সিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও নির্মাণ ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। এই খাতে নারীর অংশগ্রহণের সুযোগও যথেষ্ট।
মেধাস্বত্ব সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের জটিলতা এবং তরুণদের দক্ষতা বাড়ানোর মতো বাধা দূর করে এই খাতের সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করা গেলে বিএনপির জন্য এটি হতে পারে নতুন গেম-চেঞ্জার।