ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ফসল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ত্রুটিমুক্ত, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য করার বিষয়ে শুরু থেকে দৃঢ় অবস্থানের কথা বলে আসছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেয়া হবে না বলে বারবার উল্লেখ করেছেন।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা নিজের ক্ষমতার বৈধতা উৎপাদনে পরপর গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনকে তামাশায় পরিণত করেন। শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, সবধরনের নির্বাচনকেই তিনি নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। ফলে দেশ থেকে গত সাড়ে ১৫ বছর নির্বাচনব্যবস্থা নির্বাসিত ছিল। এতে নাগরিকসাধারণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। পরিণতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যায়। একই সাথে দেশের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা হয়।

বিগত সময়ে নির্বাচনব্যবস্থার করুণ হালের কারণে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা যেনতেন রকমের কোনো নির্বাচন করতে চান না। একটি অর্থবহ নির্বাচন আঞ্জাম দিতে তার সরকার সচেষ্ট। এ ছাড়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে যুগোপযোগী করতে গত ১৫ বছরে স্তূপীকৃত জঞ্জাল অপসারণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জন-অভিপ্রায়কে প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রসংস্কার, গুম-খুন ও জুলাই গণহত্যার বিচার করা এবং একটি অর্থবহ নির্বাচন আয়োজনে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রয়োজনীয় সময় দেয়া ছিল ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের জন্য অবশ্যকরণীয় কাজ। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, কিছু দল রাষ্ট্র সংস্কারের চেয়ে শুধু নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। দলগুলোর শীর্ষপর্যায় থেকে যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করা হয়। তবে তাদের ধারণা যে অমূলক, তা এখন প্রমাণিত হলো প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনী প্রস্তুতির নির্দেশনায়। ফেব্রুয়ারি অথবা এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা। এখন নির্বাচন নিয়ে সবধরনের সংশয়-আশঙ্কা দূর হয়েছে। নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গত তিন নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করা প্রিজাইডিং কর্মকর্তাদের যথাসম্ভব বাদ দেয়া, সব ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, দায়িত্বরত পুলিশের শরীরে ক্যামেরা স্থাপনেরও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা।

সরকারিভাবে আরো জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর হতে বলেছেন ড. ইউনূস। নির্বাচনের আগে সব ডিসি, এসপি, ইউএনও, ওসি বদল করা এবং নির্বাচনে লটারির মাধ্যমে দায়িত্ব দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

হাতেগোনা কয়েকটি দল আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার আন্তরিকতার ব্যাপারে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করে। ওই সব দলের দাবি ছিল, নির্বাচনের বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট পথনকশা দিতে হবে সরকারকে। পরে জাতির উদ্দেশে ভাষণে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামী বছরের এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেন। এরপরও ওই সব দলের সংশয় দূর হয়নি। এবার ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার নির্দেশে তাদের সংশয় নিশ্চয় ঘুচেছে।

আমরা আশা করি, এবার জন-আকাক্সক্ষা বাস্তবে রূপ দিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রতিশ্রুত সুষ্ঠু অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দেশপ্রেমিক সব রাজনৈতিক দল সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।