চট্টগ্রাম বন্দরের একটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা দেয়ার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন চলছে। শুধু আন্দোলন নয়, একের পর এক আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের রায় সরকারের পক্ষে আসার পরও আন্দোলন থামছে না। সত্য-মিথ্যা জড়িয়ে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এ ধরনের চুক্তি করা হলে তা হবে জাতীয় স্বার্থবিরোধী, দেশের সার্বভৌমত্বের বিরোধী। এসব কথা একেবারেই ভিত্তিহীন। বিশ্বের বহু দেশ অন্য দেশের কোম্পানি দিয়ে বন্দর পরিচালনা করে। তাদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না।
এ কথা সত্য, স্থানীয় অপারেটরদের পরিচালনায় গত ৫৪ বছরেও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক মান দূরের কথা, ন্যূনতম সন্তোষজনক পর্যায়েও নেয়া যায়নি। আমাদের আশপাশের দেশগুলো যতটা দক্ষতার সাথে বন্দর পরিচালনা করে তারও ধারেকাছে নেই আমরা। যে কাজ ভিয়েতনামের বন্দরে তিন দিনে সম্পন্ন হয়, সেই একই কাজ চট্টগ্রাম বন্দরে কেন ছয় দিন লাগবে? এ অবস্থা চলতে পারে না।
বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা পিছিয়ে থাকব, এটি হতে পারে না। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ করে আমদানি-রফতানিতে গতি আনতে হলে বন্দরের দক্ষতা শীর্ষ পর্যায়ে নিতেই হবে। এ জন্য দরকার বিদেশী অপারেটর নিয়োগ করা। সরকার সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেয়ার জন্য আলোচনা চলছে। আলোচনা সন্তোষজনকভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর চুক্তি হবে; কিন্তু তার আগেই বাধা দেয়া হচ্ছে। শুধু বন্দরের শ্রমিক সংগঠন আন্দোলন করছে তা নয়। এদের পেছনে বড় বড় স্বার্থবাদী গোষ্ঠী জড়িত। এরা সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে নানা যুক্তি তোলার চেষ্টা করছে। যে বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে তাকেই বলা হচ্ছে অস্বচ্ছ, যথেষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি— ইত্যাদি। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে চুক্তি করার এখতিয়ার নিয়েও আপত্তি তোলা হচ্ছে। এসব মূলত দেশকে স্থবির করে রাখার প্রাচীন মানসিকতা।
আন্দোলনরত শ্রমিক-কর্মচারী নেতারা মূলত চুক্তির ভালো-মন্দ নিয়ে ভাবছেনই না। তারা বলছেন, বিদেশী কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়াই যাবে না। এই দাবিতে বন্দর অচল করে দিয়ে তারা দেশের শত শত কোটি টাকার ক্ষতি করছেন। শুধু তাই নয়, রমজানের আগে দেশবাসীকেও জিম্মি করে ফেলছেন। বন্দর বন্ধ থাকায় রমজানের পণ্য খালাস হচ্ছে না। সামনে বাজার অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এর বাইরেও আছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে পণ্যবাহী জাহাজ বন্দরের বাইরে নোঙর করে রেখেছে। পণ্য খালাসে এই বিলম্বের ফলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশী কোম্পানিকে দেয়ার উদ্যোগের সাথে এসবের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে সেই বিদেশী শক্তিরও যারা বাংলাদেশকে চিরকাল পদানত রাখতে চায়। তাই বন্দর নিয়ে সিদ্ধান্ত দ্রুতই হওয়ার দরকার। নির্বাচিত সরকারের জন্য ফেলে রাখার কোনো যুক্তি নেই।
আমরা চাই, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সরকারের চুক্তি যেন উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে। চুক্তির স্বচ্ছতা যেন নিশ্চিত করা হয়। ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তির মতো দেশ বিক্রির গোপন চুক্তি যেন না হয়।