বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা জুলাইয়ে অনন্য এক বিপ্লব করেছেন। এমন জাগরণ কল্পনাতীত। জাতি তাই বড় ধরনের আশা পোষণ করছিল সমৃদ্ধ এক রাষ্ট্র বিনির্মাণের। বিপ্লব-পরবর্তী সরকার গঠনে কিছু ভুল এর উচ্চ সম্ভাবনা সঙ্কুচিত করেছে। বিপ্লবের পক্ষগুলো অল্প সময়ের মধ্যে বিভক্ত হওয়ায় সঙ্কট আরো ঘণীভূত হয়েছে। দাবি-দাওয়া আদায় নিয়ে দায়-দায়িত্বহীন আন্দোলন পরিস্থিতি নাজুক করেছে। সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী রাষ্ট্র কাঠামো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে অংশীজনরা প্রয়োজনীয় সহায়তা না করায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদত্যাগ নিয়ে চিন্তা করছেন। এ অবস্থায় সৃষ্ট অনিশ্চয়তা দূর করতে দরকার জাতীয় ঐক্য।
ড. ইউনূস উপদেষ্টা পরিষদের সভায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। আশানুরূপ কাজ করতে পারছেন না বলে পরিষদের সদস্যদের জানিয়ে তিনি সরকার থেকে চলে যেতে চান। তিনি আরো বলেছেন, তারা যেন আরেকটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, জনজোয়ারে ফ্যাসিবাদের দানব ভেসে গেলেও পরবর্তী বাংলাদেশ আরো বড় সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে, ঠিক এমন একটি সময় ড. ইউনূস কাণ্ডারি হয়ে এসেছেন। শেখ হাসিনার দুঃশাসনে বিদেশী শক্তি বাংলাদেশকে গিলে খাওয়ার উপক্রম করেছিল। হাসিনা পালানোর পর প্রতিবেশী বৃহৎ দেশ সম্পূর্ণ অসহযোগিতার নীতি নিয়েছে। প্রথমে জুলাই বিপ্লবকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা করেছে। এ লক্ষ্যে দেশটির মিডিয়া মিথ্যা, ভুল ও অপতথ্য ছড়িয়েছে। একই সাথে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ধুয়া তুলেছে।
ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক খ্যাতি এই শত্রুতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। বৈশ্বিক প্রতিকূলতা কাটাতে বটবৃক্ষের মতো কাজ করেছেন তিনি। পাশাপাশি ভঙ্গুর অর্থনীতি খাদের তলা থেকে তুলে আনতে দক্ষতা দেখিয়েছেন। এ অবস্থায় তিনি চলে গেলে সৃষ্ট চলমান ঘোলাটে পরিবেশ থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। আমাদের ক্ষতি করতে চাওয়া পক্ষগুলো এমনটি চায়। যা কোনোভাবে হতে দেয়া যায় না। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরণে বিভাজন বা ফাটল ধরিয়ে সুবিধা নিতে চায়। নিজেদের মধ্যে বিভাজন দেশপ্রেমিক শক্তিগুলোর জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না। ড. ইউনূস সরকার প্রতিশ্রুত সময়ে নির্বাচন না করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করবে এমন কোনো কাজ এখনো করেনি। এ অবস্থায় সরকারকে চাপ প্রদর্শন কোনোভাবেই কাম্য নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সংস্কার ও সময়মতো নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করা।
ড. ইউনূস সরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করায় বড় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এমন আস্থাহীন অবস্থা নিয়ে সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। কাজটি রাজনৈতিক দলগুলোর। সব দল বলে, দলের চেয়ে দেশ বড়। দেশ এক গুরুতর সন্ধিক্ষণে অবস্থান করায় এই আদর্শ বাস্তবে প্রদর্শনের এখনই সময়। সবাই দেশপ্রেম জাগ্রত করে সাড়া দেয়ার উত্তম সময় এটি। এ ক্ষেত্রে সরকার সর্বদলীয় বৈঠক ডেকে সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করে উদ্ভূত পরিস্থিতি উত্তরণে দিশা খুঁজতে পারে বলে আমরা মনে করি।