উচ্চফলনের আশায় কৃষিতে বাধাহীনভাবে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দেশের প্রাণবৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের চিত্র বোঝা যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে। সংস্থাটি তথ্য মতে, ১৯৭২ সালে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার ছিল চার হাজার টন। ১৯৮০ সালে পাঁচ হাজার টন এবং ২০০০ সালে এটি বেড়ে দাঁড়ায় আট হাজার টনে। এরপর মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে (২০২২ সালের হিসাব) বালাইনাশকের ব্যবহার অস্বাভাবিক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার টনে। এই পরিসংখ্যান দেখার পর নিশ্চিত করে বলা যায়, গত দুই বছরে এর ব্যবহার আরো বেড়েছে বৈ কমেনি।
ফসলের মাঠে বালাইনাশক ব্যবহারে কীটপতঙ্গ আসে না, এলেও মারা পড়ে। কীটনাশক প্রয়োগে উপকারী পোকামাকড়ের ডিম মারা যায়। এর অতিরিক্ত ব্যবহার জনস্বাস্থ্য তো বটে, পুরো প্রাণিকুলকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। অতিরিক্ত কীটনাশকে মারা পড়ছে পরাগায়নে সবচেয়ে জরুরি উপকারী সব পতঙ্গ। অথচ ফসল উৎপাদনে পরাগায়নের বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে কিছু কীটপতঙ্গের ভূমিকা অনস্বীকার্য। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে বিপন্নের পথে পরাগায়নে অতি জরুরি মৌমাছি। পৃথিবীর ৮৬ শতাংশ পরাগায়ন মৌমাছির মাধ্যমে হয়। আমাদের দেশে বর্তমানে ছয় প্রজাতির মৌমাছির মধ্যে চারটি বিলুপ্তির পথে। মৌমাছি শুধু মধু উৎপাদন করে না, খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও অসাধারণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু কীটনাশক প্রয়োগে সেই মৌমাছিই মারা পড়ছে। একইভাবে প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছ শিকারে কীটনাশক ব্যবহার করায় হারিয়ে যাচ্ছে শামুক-ঝিনুকসহ অনেক জলজপ্রাণী। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে এক সময় শস্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ভয়াবহ সঙ্কটে পড়বে আমাদের কৃষিব্যবস্থা।
এক সময় হাওরে চাষাবাদ হতো প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে। এখন শতভাগ জমিতে হাইব্রিড-উফশী জাতের ধান চাষ হয়। ফলন বাড়াতে কৃষক রিফিট, সার, বিষ ও বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করছেন। ফলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস হচ্ছে। কীটপতঙ্গ কমে যাওয়ায় খাদ্যের অভাবে পাখপাখালিও কমছে।
এর প্রমাণ মিলে হাওরাঞ্চলে পাখির সংখ্যা ও প্রজাতি কমে যাওয়ায়। দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতে চলতি বছর শুমারিতে ৬০ প্রজাতির মোট ৩৫ হাজার ২৬৮ পাখি পাওয়া গেছে। এক বছর আগে ২০২৩ সালের শুমারিতে পাওয়া যায় ৫২ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৭৭৮ পাখি। একই অবস্থা লাখ লাখ প্রাণীর আবাসস্থল সুন্দরবনের। কৃষি ও মাছের ঘের তৈরিতে ব্যবহৃত কীটনাশক নির্বিঘ্নে চলে যাচ্ছে সুন্দরবনে। অথচ সুন্দরবনে কোনো কৃষিকাজ হয় না।
দেশে নতুন নতুন কোম্পানি বালাইনাশক নিয়ে হাজির হচ্ছে। এরা মাঠপর্যায়ের ডিলারদের বেশি কমিশন দিয়ে প্রলুব্ধ করছে। কিন্তু কীটনাশকের বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আনা দরকার। এ জন্য বর্তমান বিধিমালা ও নীতিমালা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাই যথাযথ নিবন্ধন, মৌসুমি সংরক্ষণ এবং আবহাওয়া বিবেচনায় কীটনাশক প্রয়োগ করা উচিত।
আমরা মনে করি, কৃষিতে নিয়ন্ত্রণহীন সার ও কীটনাশক প্রয়োগ রোধে কীটনাশক ব্যবসায় ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। সেই সাথে বিষমুক্ত বিকল্প পদ্ধতির উদ্ভাবন করতে হবে। পাশাপাশি জমিতে পরিমিত সার প্রয়োগ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তা হলে বল্গাহীন কীটনাশক প্রয়োগের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে আমাদের প্রাণবৈচিত্র্যের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।