শেখ হাসিনা বিরোধীদের জন্য বাংলাদেশকে নরক বানিয়েছিলেন। যাকে ইচ্ছা তাকে গুম-খুন করেছেন, গুপ্ত কারাগারে আটক রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছেন। এ কাজে তার সঙ্গী হয়েছে এক জল্লাদ চক্র। শেখ হাসিনার কখনো মনে হয়নি, সীমাহীন এ ক্ষমতা তাকে ছাড়তে হবে। শেষ পর্যন্ত তাকে পালিয়ে যেতে হয়েছে। তার চেয়েও করুণ বিষয় হচ্ছেÑ তার চক্রের মধ্যে কারো কারো বোধোদয় হচ্ছে। যারা তার সব অপরাধ ফাঁস করে দেবেন। ইতোমধ্যে তার পুলিশপ্রধান সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল-মামুন জুলাই বিপ্লবের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় স্বীকার করে রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন আদালতে। ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত-১-এ গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যার অভিযোগে হাসিনা ও তার প্রধান সহযোগী তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল এবং আইজিপি আব্দুল্লাহ আল-মামুনের বিচার শুরু হয়েছে। এ মামলার সূচনা বক্তব্যের জন্য ৩ আগস্ট ও সাক্ষ্য গ্রহণ ৪ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অভিযোগ গঠনের দিন আদালতে মামুন বলেন, ‘জুলাই-আগস্ট হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলাম। আমি আমার দোষ স্বীকার করছি, মামলার সব রহস্য উন্মোচনে সহযোগিতা করব। এ মামলায় আমি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাজসাক্ষী হতে চাই। আমি স্বেচ্ছায় মামলার সাথে সম্পর্কিত আমার জ্ঞানের মধ্যে থাকা সব পরিস্থিতির সত্য এবং পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করতে ইচ্ছুক।’ আদালত মামুনের রাজসাক্ষী হওয়ার এ আবেদন মঞ্জুর করেছেন।
জুলাই গণহত্যা নিয়ে ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিয়েছে। সেই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনা ও তার খুনিচক্রের দ্বারা দুই হাজারের কাছাকাছি হত্যা, ৩০ হাজার মানুষের গুরুতর আহত করার দলিল যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে এ প্রমাণ পাওয়া গেছে, শেখ হাসিনা সরাসরি প্রাণঘাতী অস্ত্র প্রয়োগ করতে বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। কয়েক দিন আগে বিবিসির একটি প্রামাণ্য চিত্রে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় গণহত্যা চালাতে হাসিনার সরাসরি নির্দেশ দেয়ার প্রমাণ দিয়েছে। তার আগেই ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল শেখ হাসিনার দেয়া মানুষ হত্যার নির্দেশের প্রমাণ সংগ্রহ করেছে। তার একটি প্রমাণ- যেখানে শেখ হাসিনা সরাসরি বলছেন, প্রাণঘাতী অস্ত্র প্রয়োগ করতে; যা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ফরেনসিক প্রতিবেদনে আদেশটি শেখ হাসিনার বলে প্রমাণ হয়েছে।
জুলাই গণহত্যার জন্য হাসিনার দায় প্রমাণ হয়ে যায় প্রকাশ্যে দেয়া সে সময়কার বিভিন্ন বক্তব্যে। এ দিকে মামুনের মতো রাজসাক্ষীরা এ পর্যায়ে যুক্ত হলে ভেতরের আরো যত খবর সব প্রকাশ হয়ে পড়বে। শেখ হাসিনার খুনে বাহিনী কে কোথায় ষড়যন্ত্র করেছে; কিভাবে কারা তা বাস্তবায়ন করেছে, সব জানা যাবে। এর ফলে এটিও পরিষ্কার হয়ে যাবেÑ দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুপ্ত কারাগার চালানোর বিষয়টিও। মামুনের মতো আরো সাক্ষী যুক্ত হতে পারেন। এদের অনেকে হয়তো অবস্থার মধ্যে পড়ে গুম-খুন করার নীতি নিয়েছিলেন। তাদের অনুশোচনা জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক। আশা করা যায়, শেখ হাসিনার করা সব অপকর্ম খোলাসা হবে। দুষ্টচক্রের মধ্যে থাকা প্রত্যেকের ব্যাপারে জানা যাবে।
জুলাই গণহত্যাসহ বিগত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনার দ্বারা জাতির বিরুদ্ধে সংঘটিত প্রত্যেকটি অপরাধের সঠিক বিচার হতে হবে। ফ্যাসিবাদের পুনরাবর্তন ঠেকানোর পাশাপাশি একটি সার্বভৌম নিরাপদ দেশ গঠনে এর বিকল্প নেই।