ভ্রমণকে অনেকেই মনে করেন শুধুই বিলাসিতা, ধনীদের শখ। আমিও আগে তেমনটাই ভাবতাম। কিন্তু অফিসের উদ্যোগে কক্সবাজার সফরের সুযোগ পেয়ে বুঝলাম, প্রকৃতির সৌন্দর্য শুধু আমাদের আনন্দই দেয় না, আমাদের মন-আত্মাকেও সতেজ করে তোলে।
অফিস থেকে কক্সবাজার পিকনিকে যাওয়ার সিদ্ধান্তের শুরুতেই ভেবেছিলাম, এতদূরে পিকনিকে না যেয়ে ধারে-কাছে কোথাও একদিনের জন্য গেলেই বোধ হয় ভালো হতো। বেশ আশংকার মধ্যেই একটু একটু করে দিন এগোচ্ছে আর ওদিকে অফিসে পিকনিকের পরিকল্পনাও বেশ জোরালোভাবে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত চলে আসলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, রাত ১০টায় ঢাকা থেকে আমরা মেহমানসহ প্রায় ৩০০ জনের একটি দল কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আটটি ফুল স্লিপার বাস ও বাকি ৫০ জন ট্রেনে করে আমাদের যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের এই সফরের আয়োজন করেছিল ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল মুগদা শাখা।
রাতের আঁধারে একে একে আটটি স্লিপার বাস ও ট্র্রেনের সহযাত্রীরা এগিয়ে চলেছে কক্সবাজারের দিকে। কক্সবাজার পৌঁছানোর উন্মুখ প্রতীক্ষা যেন আর শেষ হতে চায় না। সকাল হতেই আমরা পৌঁছে গেলাম স্বপ্নের গন্তব্যে- বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে। কেউ প্রথমেই সমুদ্র দেখতে ছুটলেন, কেউ হোটেলে গিয়ে নাশতা সেরে নিলেন। যারা একটু দেরিতে সমুদ্র সৈকতে গেলেন, তাদের মনে তখন আফসোস- ‘ইশ! আগে গেলে আরো বেশি উপভোগ করতে পারতাম!’
সাগরের বিশাল ঢেউ, অবিরাম গর্জন, লবণাক্ত বাতাস সব মিলিয়ে মনে এক অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। তীরে ঢেউয়ের আছড়ে পড়া, নিমেষেই তা আবার মিলিয়ে যাওয়া দেখলে মনে হয় যেন ঢেউ আমাদের সাথে খেলা করছে। বালুকাবেলার কোমল স্পর্শে পা ডুবিয়ে হাঁটার আনন্দটাই অন্যরকম। গভীর সমুদ্রের দিকে তাকালে মনে হয় নীল আকাশ সমুদ্রের ওপারে গিয়ে মিশে গেছে।
আমাদের সফরে কেবল কক্সবাজার সৈকতই ছিল না, ছিল আশপাশের নানা আকর্ষণীয় স্থানও। প্রথমেই আমরা গেলাম কলাতলী বিচে। কলাতলী মোড় থেকে সামনে এগোলে রাস্তার বামে পড়ে সুগন্ধা বিচ ও লাবনী বিচ। রাস্তার ডানে বিশাল বিশাল হোটেল ও রিসোর্ট।
সারারাত পর্যটকদের পথচলায় এ এলাকা মুখর থাকে। বাস কাউন্টার, বিমান টিকেট কাউন্টার কলাতলী মোড়েই রয়েছে। ট্রেন স্টেশনও খুব কাছেই। তবে টিকেট পাওয়া কষ্টসাধ্য। সপ্তাহখানেক আগেই টিকেট নিতে হবে অনলাইন অথবা কাউন্টার থেকে। বিমানে এলে খুব সম্ভবত পাঁচ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। আমার মতে, ট্রেনে আসাটাই সব থেকে সুবিধাজনক। কম খরচে ঝামেলা ছাড়াই কক্সবাজার ভ্রমণ করা যায়। তবে ট্রেনের ক্ষেত্রে টিকেট আগে নিতে হয়। এছাড়াও এসি-নন এসি বাসে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। এসব বাসে খরচ কিছুটা কম হয়।
কলাতলীর পর আমরা গেলাম হিমছড়িতে। হিমছড়ি এসেই টিকেট নিয়ে আমরা ঝর্ণা দেখার জন্য প্রবেশ করি। টিকেট নিয়ে গেট দিয়ে প্রবেশ করেই দেখি বাহারি বার্মিজ পোশাক, নানারকম আচার যেমন-কাঁচা মরিচের আচার, টক-মিষ্টি তেঁতুলের আচার, বড়ইয়ের আচার, রসুনের আচার, আঙ্গুরের আচারসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্রের পশরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। মুক্তার মালা, ঝিনুকের মালা, ব্রেসলেট, চুড়ি, ব্যাগসহ রয়েছে মেয়েদের গহনা।
এছাড়াও রয়েছে নানা ধরনের শুটকি মাছ। পলিথিনের ব্যাগে করে শুটকি মাছ দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। শুটকি মাছের পাশাপাশি রয়েছে তাজা মাছের দোকান। লাইটিং করে চোখে পড়ার মতো করে তাজা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, অক্টোপাস নিয়ে দোকানিরা সাজিয়েছেন মাছের দোকান। এখানে কচ্ছপও বিক্রি হয়।
অন্যান্য বিচে পাথর দেখা না গেলেও ইনানী বিচে পাথর ও প্রবাল দেখতে পাওয়া যায়। পর্যটকরা এসব পাথরের উপর দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। ইনানী বিচে ঘোড়ায় উঠে ছবি তোলেন অনেকেই। এসব ঘোড়ায় চড়ে বিচ ঘুরে দেখারও সুযোগ রয়েছে। খরচ পরবে ১০০ টাকা। শুধু ছবি তোলার জন্য খরচ হবে ৫০ টাকা। এখানে ইঞ্জিনচালিত মোটরযানে ঘোরারও ব্যবস্থা রয়েছে।
হিমছড়ি ঝর্ণা, ইনানী বিচ ও পাটুয়ারটেক যেতে খোলা জীপ ভাড়া নিলে ভালো হয়। খোলা জীপে আশপাশের দৃশ্য ভালোভাবে উপভোগ করা যায়। তবে একা হলে মোটরসাইকেল বা অটোরিক্সায়ও যাওয়া যায়। যাওয়ার পথে হাতের ডানে পড়ে বিশাল সমুদ্র। পাহাড় ঘেষে পিচঢালাই সরু রাস্তা এঁকে-বেঁকে চলে গেছে। হাতের বামেই দেখা যায় সুউচ্চ পাহাড়। মনে হয় যেন আকাশ ছুঁয়েছে।
পাটুয়ারটেকে রেস্টুরেন্টে আমরা পাহাড়ী মুরগির গোশত খেয়েছিলাম। সাথে খেয়েছিলাম রুপচাঁদা ফ্রাই। এখানে অনেকগুলো রিসোর্ট ও মজার মজার খাবারের জন্য বিখ্যাত নানা রকমের রেস্টুরেন্টের দেখা পাওয়া যায়।
একফাঁকে সৌভাগ্যক্রমে আমরা কয়েকজন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত দেখে এসেছি। সমুদ্রের দিকে তাকালেই দেখা যায় বিশাল আকৃতির বানিজ্যিক জাহাজ সমুদ্রের মাঝে নোঙ্গর করে আছে। পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের কাছেই রয়েছে কর্নফুলী টানেল। এতো কাছে এসে টানেলটি না দেখলেই নয়। মুহুর্তের মধ্যেই মাইক্রোবাস নিয়ে ঢুকে গেলাম কর্নফুলী টানেলে। দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই আমরা এসে গেলাম কর্নফুলীর ওপারে আনোয়ারা থানায়। এরপর বাঁশখালী থানা হয়ে সোজা কক্সবাজার।
কক্সবাজার ভ্রমণ আমাদের জন্য শুধু এক আনন্দযাত্রা ছিল না, এটি ছিল প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। আল্লাহর সৃষ্টি দেখে বারবার মনে হয়েছে- এই বিশালতা, এই অপরূপ সৌন্দর্য, সত্যিই অসাধারণ।