উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের লোনা মাটিতে এবার নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন। উপকূলীয় রামপাল উপজেলার সন্ন্যাসীর হাজীপাড়া এলাকায় নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন সৌদি খেজুরের বিশাল বাগান। চিংড়ি ঘেরের মাটি কেটে বাগান তৈরি করেন এ উদ্যোক্তা। সেই সখের বাগানে এখন ৪০০ সৌদি খেজুরের গাছ। এরই মধ্যে ফলন এসেছে অর্ধ শতাধিক গাছে।
সরেজমিনে গিয়ে আলাপকালে জাকির হোসেন জানান, তার ৩০ বিঘা জমির মৎস্য খামারের বেড়িবাঁধে সৌদি খেজুর গাছ চাষ করছেন। তার বাগানে গাছের সংখ্যা ৪০০ প্রায়। প্রথমে এলাকাবাসী উপহাস করলেও গত দু’বছর ধরে খেজুরের ফলন দেখে অবাক। গাছে ঝুলছে আজোয়া, মরিয়ম, আম্বার, বারিহীসহ অন্তত পাঁচটি জাতের খেজুর।
নার্সারি দেখতে আসা পিসি কলেজের ছাত্র বাদশা বলেন, আমি যাত্রাপুর থেকে রামপাল এসেছি জাকির হোসেনের সৌদি খেজুরের বাগানটি দেখার জন্য। মরুভূমি সৌদি আরবের খেজুর আমাদের দেশে চাষ হচ্ছে এটা সত্যিই অবাক করার মতো।
স্থানীয় বাসিন্দা সুমন বলেন, তার এই সৌদি খেজুরের সারিসারি গাছ দেখে অবাক হয়েছি। মরুর দেশে জন্ম নেয়া ফল এখন আমাদের এই অঞ্চলে চাষ হচ্ছে ভাবতেই খুব ভালো লাগছে। এলাকাবাসী ও প্রশাসনের সহায়তা ও অনুপ্রেরণা পেলে আরো ভাল করতে পারবেন বলেও মত দেন।
খামার পরিচালনার দায়িত্বে থাকা রেজাউল তরফদার বলেন, খেজুর গাছের পরিচর্যা তেমন কিছু নয়। জৈব সার প্রয়োগ করি এবং মাসে একবার গাছগুলোতে স্প্রে করে দেই। তবে গন্ডার পোকা গাছের মূলে খেয়ে ফেলে। এই পোকার ওষুধ পাওয়া গেলে গাছের ফলন আরো ভালো হবে। তাই গাছগুলো যেন রোগমুক্ত থাকে, সেজন্য সময়মতো ঔষধ ব্যবহার করতে হয়।
এছাড়া বর্ষা মৌসুমে পেপার দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। না হলে বৃষ্টির পানি লেগে খেজুর নষ্ট হয়ে যায়। গাছে কলম বাঁধতে হয়। এই খেজুর গাছের সব চেয়ে বেশি ক্ষতিকর হচ্ছে কটা পোকা। খেজুর পাকা শুরু করলে একটা সুগন্ধ ভেসে বেড়ায় আর এই গন্ধে পাখি আসে এসে খেজুর নষ্ট করে ফেলে।
সফল উদ্যোক্তা অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন বলেন, ২০১৪ সালে ৩০বিঘা জমিতে নয়টি পুকুর খনন করে চিংড়ি ও সাদা মাছ চাষ শুরু করি। পুকুরের পাড় জুড়ে বিভিন্ন ফলজ গাছ রোপণ করলেও লোনা পানির জন্য লাভ হচ্ছিল না। তারপর কয়েক বছরে বাগদা চিংড়িতেও লোকসানে পড়ি।

পরে হতাশা কাটিয়ে উঠতে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘রামপাল সৌদি খেজুর বাগান’ নাম দিয়ে এই খেজুর চাষ শুরু করি। প্রথম দিকে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে ৬০টি সৌদি খেজুরের চারা এনে রোপণ করি। বর্তমানে আমার বাগানে আজোয়া, মরিয়ম, সুকারি, আম্বার ও বারহি এই পাঁচ জাতের ৪০০টি ছোট বড় খেজুর গাছ রয়েছে।
বর্তমানে ৮০টি গাছে ফলন হলেও আগামী এক বছরের মধ্যে বাগানের অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ গাছে খেজুর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী বছর থেকে বাণিজ্যিক উপায়ে আরো খেজুর ও চারা বিক্রি করতে পারব। ভবিষ্যতে এই নার্সারিতে আরো অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো: মোতাহার হোসেন বলেন, সৌদি খেজুর মরুভূমির ফসল। লোনা পানির জমিতে এই ফসল চাষের খবর শুনে প্রথমে একটু অবাকই হয়েছিলাম। পরে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন নামের এক ব্যক্তি খেজুর চাষে সফলতা পেয়েছেন। এখন যদি খেজুরের স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও উৎপাদনের পরিমাণ ঠিক থাকে, তাহলে লোনা পানির এলাকার জন্য এটি একটি নতুন দৃষ্টান্ত হবে।
সৌদি খেজুর চাষের এই উদ্যোগকে সামনের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।