দেশের অন্যতম বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ লিজের মাধ্যমে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
নতুন বহরে থাকবে ১৫টি অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৩৭-৮ ও ৬টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণের পাশাপাশি ইউএস-বাংলাকে একটি সমন্বিত বৈশ্বিক এভিয়েশন গ্রুপে রূপান্তরের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
বুধবার রাজধানীতে আয়োজিত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ‘বিয়ন্ড উইথ বোয়িং’ অনুষ্ঠানে এসব ঘোষণা দেয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র ও বেসামরিক বিমান চলাচল বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (সেলস) পল রিগি, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিএএবি) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো: মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও বিমান চলাচল খাতের অংশীজনরা।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী মিল্লাত বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র (রিজিওনাল এভিয়েশন হাব) হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের বিমান চলাচল খাতের সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে আমরা একটি ‘এভিয়েশন মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করছি এবং বগুড়ায় একটি পাইলট প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে দেশের বিমান চলাচল সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে।
তিনি বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে ২ কোটি ৪০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেয়া সম্ভব হবে।
ইউএস-বাংলার বহরে ২১টি বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে দেশের ক্রমবর্ধমান বিমান ভ্রমণ চাহিদা পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, একই সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সও তাদের বহরে আরো ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করতে যাচ্ছে, যা দেশের বিমান চলাচল খাতের প্রবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করবে।
এ সময় তিনি আরো বলেন, বোয়িংয়ের সাথে আজকের এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের বিমান চলাচল বাজারের প্রতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন। একইসাথে এটি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বন্ধুত্ব ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে আরো শক্তিশালী করবে।
বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (সেলস) পল রিগি বলেন, ইউএস-বাংলার বহরে বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানটির প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
তিনি আরো বলেন, আজকের দিনটি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। আধুনিক ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী বোয়িং উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করার মাধ্যমে তারা প্রবৃদ্ধির নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে।
রিগি বলেন, এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের ভবিষ্যতের প্রতি ইউএস-বাংলার আস্থা ও সংযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন।
এ সময় তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে ইউএস-বাংলা তাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখায় বোয়িং উড়োজাহাজ অধিক জ্বালানি দক্ষতা, নির্ভরযোগ্য পরিচালন সক্ষমতা ও উন্নত যাত্রীসেবার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করবে।
পল রিগি বলেন, বোয়িংয়ের পক্ষ থেকে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে এ মাইলফলকের জন্য অভিনন্দন জানাই। আপনারদের এই যাত্রার অংশ হতে পেরে আমরা গর্বিত এবং আমাদের প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের প্রতি যে আস্থা রাখা হয়েছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, বোয়িং ইউএস-বাংলার সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক আরো জোরদার করতে এবং প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে আগ্রহী।
ইউএস-বাংলা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এই বিনিয়োগ শুধু বহর সম্প্রসারণ নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর পরিকল্পনার অংশ।
তিনি বলেন, এই বিনিয়োগ কেবল উড়োজাহাজের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নয়। আমাদের লক্ষ্য ইউএস-বাংলাকে একটি বিমান সংস্থা থেকে পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক এভিয়েশন গ্রুপে রূপান্তর করা।
ইউএস-বাংলা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য উড়োজাহাজের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, কার্গো, ক্যাটারিং ও বিমান চলাচল অবকাঠামোতেও বিনিয়োগ করা হবে।
এ সময় মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন আরো বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান ভ্রমণ বাজারের বার্ষিক আকার প্রায় ৫৮০ কোটি মার্কিন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক যাত্রীর বড় অংশ বিদেশী বিমান সংস্থাগুলো পরিবহন করায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক রুটে দেশীয় এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা বাড়বে এবং সেই বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ দেশে রাখা সম্ভব হবে।
নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ার পর ইউএস-বাংলা দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিদ্যমান আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়াবে।
এছাড়া বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, কলম্বো, কাঠমান্ডু, কুনমিং, শেনজেন, বেইজিং, জোহর বাহরু ও পেনাংসহ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে কুয়েত, বাহরাইন, মদিনা, দাম্মাম ও সালালাহ রুটেও ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্ক কৌশলের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ও সিলেটকে আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য সরাসরি আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ানো যায়।
যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি ইউএস-বাংলা একটি এভিয়েশন প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠা, উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল (এমআরও) সুবিধা গড়ে তোলা, একটি স্বতন্ত্র এয়ার কার্গো এয়ারলাইন্স চালু এবং দেশী-বিদেশী বিমান সংস্থার জন্য আধুনিক ফ্লাইট ক্যাটারিং সুবিধা স্থাপনের পরিকল্পনাও নিয়েছে।
মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের বহু ক্যাডেট পাইলটকে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। ভবিষ্যতে দক্ষ পাইলট ও এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার তৈরির লক্ষ্যে এ খাতে বিনিয়োগ আরো বাড়ানো হবে।
তিনি বলেন, আগামী দুই দশকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষস্থানীয় বিমান চলাচল বাজারগুলোর অন্যতম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সক্ষমতা রাখে।
২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বর্তমানে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা। সংস্থাটি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহন সেবা পরিচালনা করছে।
যাত্রী পরিবহন, কার্গো, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও বিমান চলাচল-সংশ্লিষ্ট সহায়ক সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক এভিয়েশন গ্রুপ হিসেবে গড়ে ওঠাই প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। সূত্র : বাসস