বহুল কাঙ্ক্ষিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা কেটে গেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের অর্থায়ন বন্ধের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রচেষ্টায় প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে জাপানের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা জাইকা। কথাবার্তা হলেও এখনো দু’দেশের মধ্যে কোনো চুক্তিপত্র হয়নি। তাই চুক্তির পরই অথার্য়ন হবে। তবে এই খবরে স্বস্তি ফিরে এসেছে উত্তরের জনপদে।
এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দেবে জাইকা। এ ছাড়া বাকি ২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করছে বাংলাদেশ সরকার।
জানা গেছে, খুব শিগগিরই শুরু হবে সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ কাজ। সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া এই নতুন রেলপথ উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আনবে যুগান্তকারী পরিবর্তন। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে এটি হবে আরেকটি মাইলফলক। এই রেলপথ শুধু দুটি জেলার সংযোগই তৈরি করছে না; বরং গোটা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পর্যটন খাতে আনবে নতুন দিগন্ত।
বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে এক হাজার ৯৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্প অনুমোদনের প্রায় ৬ বছর পর ভূমি অধিগ্রহণে এই অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। এর মধ্যে বগুড়া অংশে খরচ হচ্ছে ৯৬০ কোটি টাকা। বগুড়া জেলা প্রশাসন বলেছে, আগামী অর্থবছরে কাজ শুরু হয়ে শেষ হবে ২০২৯ সালের শেষের দিকে।
গত ১৬ জুন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব শফিউর রহমানের স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে ভূমি অধিগ্রহণের এসব তথ্য জানা গেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের অনুকূলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ করা অর্থ থেকে মূলধন ব্যয় খাতের ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ অর্থ অবমুক্ত করা হলো।
জানা যায়, বহুল প্রত্যাশিত বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ নির্মাণের অপেক্ষায় এ অঞ্চলের মানুষ। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের মানুষের ঢাকায় যাতায়াতের প্রধান ভরসা হচ্ছে যমুনা সেতু হয়ে ও সড়কপথ। রেলপথ থাকলেও বগুড়া থেকে নাটোর, পাবনার ঈশ্বরদী হয়ে যমুনা রেলসেতু পার হতে হয়। এর ফলে বেশি দূরত্ব ও ভাড়া গুণতে হয় বেশি। নতুন এই রেলপথ সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া হয়ে উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট, জয়পুরহাট, দিনাজপুর এবং পঞ্চগড়ের সাথে ঢাকা ও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের দূরত্ব অনেক কমে যাবে। সিরাজগঞ্জ-বগুড়া সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হলে ঢাকা-বগুড়া যাত্রায় সময় কমবে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা। কারণ, বর্তমানে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জের প্রকৃত দূরত্ব মাত্র ৭২ কিলোমিটার হওয়া সত্ত্বেও দুই জেলার মধ্যে সরাসরি কোনো রেলপথ না থাকায় এই অঞ্চলের ট্রেনগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পাবনা, সান্তাহার, নাটোর ও ঈশ্বরদী হয়ে প্রায় ১২০ কিলোমিটার ঘুরতে হয়। এতে ঢাকা থেকে বগুড়া পৌঁছাতে বর্তমানে ট্রেনে সময় লাগে প্রায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সাথে উত্তরাঞ্চলের দূরত্ব ১১২ কিলোমিটার কমে যাবে এবং সময় লাগবে ৪ ঘণ্টা।
বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পের পরিচালক মো: মনিরুল ইসলাম ফিরোজী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের আওতায় ডুয়েল গেজের দুটি রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একটি হলো- বগুড়ার ছোট বেলাইল এলাকা থেকে সিরাজগঞ্জের এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত ৭৩ কিলোমিটার এবং অপরটি বগুড়ার কাহালু স্টেশন থেকে রানীরহাট পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার।
বগুড়া জেলা প্রশাসক হোসনা আফরোজা জানিয়েছেন, জমি অধিগ্রণের বরাদ্দের অর্থ দিয়ে কাজ শুরু হবে।