অভিন্ন চাকরিবিধি বাস্তবায়ন, দমন-পীড়ন বন্ধ, মামলা প্রত্যাহারসহসহ সাত দফা দাবিতে তৃতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

শুক্রবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন সারা দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারী। গত বুধবার থেকে তাদের এই অবস্থান কর্মসূচি চলছে।

তাদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির যৌক্তিক সংস্কার চাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

তাদের সাত দফা দাবি হলো-

১) আরইবির অত্যাচারি ও স্বৈরাচার চেয়ারম্যানকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।

২) জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৫ গৃহীত মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক ও অভিন্ন চাকরবিধী প্রণয়নসহ পবিস ও আরইবি একীভূতকরণের প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।

৩) মিটার রিডার কাম ম্যাসেঞ্জার, লাইন শ্রমিক ও পৌষ্য কর্মীদের চাকরি নিয়মিত করতে হবে।

৪) মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারপূর্বক চাকরিচ্যুতদের স্বপদে বহাল করতে হবে।

৫) হয়রানি ও শাস্তিমূলক বদলি আদেশ বাতিল এবং সংযুক্ত ও সাময়িক বরখাস্ত কর্মীদের সংযুক্তি ও বরখাস্ত আদেশ বাতিলপূর্বক অবিলম্বে পদায়ন করতে হবে।

৬) জরুরি কাজে নিয়োজিত কর্মীদের আন্তর্জাতিক নিয়ম/ শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা/ শিফটিং ডিউটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

৭) সংস্কার কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন বোর্ড গঠন করে সমিতি পরিচালনা করতে হবে।

এর আগে গত ১৮ মে বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিতে পুনর্বহাল ও মামলা প্রত্যাহার, এক ও অভিন্ন সার্ভিস কোড বাস্তবায়ন এবং অনিয়মিতদের নিয়মতকরণসহ বিদ্যমান সঙ্কট সমাধানে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আলোচনায় বসার আল্টিমেটাম দেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অভিযোগ করেন, নিম্নমানের মালামাল দিয়ে ভঙ্গুর বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা নির্মাণ করে গ্রাহক হয়রানি এবং গ্রাহক বনাম সমিতির কর্মরত কর্মচারীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া, আরইবির ব্যর্থতার দায়ভার সমিতিগুলোর উপর চাপানো, নানা আর্থিক অনিয়ম; কর্মক্ষেত্রে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করা কর্মীর দায় না নিয়ে বরং সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি ও জুলুম ইত্যাদি কারণে দীর্ঘকালের অসন্তোষের প্রেক্ষিতে গত বছরের জানুয়ারি থেকে সমিতিগুলোতে সম্মিলিত আন্দোলনের সূত্রপাত।

তাদের অভিযোগ, যৌক্তিক দাবিতে নিয়মানুযায়ী প্রথমে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, এরপর বিদ্যুৎ সচিব এবং পরবর্তীতে তৎকালীন মন্ত্রণালয় প্রধানকে লিখিতভাবে জানানো হয়। এরপর থেকেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর উপর পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের দমন-পীড়ন শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৫ মে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও গ্রাহকসেবা অক্ষুণ্ণ রেখে আন্দোলনে যেতে বাধ্য হয়। বিদ্যুৎ বিভাগ, আরইবি এবং সমিতির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তাদের আশ্বাসের প্রেক্ষিতে কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের ১০ মে তারিখে সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও সমিতির প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তদুপরি এই সময়ের মধ্যে আরইবি কর্তৃক ‘বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড আইন-২০১৩’ সংশোধনের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে গিয়ে গ্রাহক এবং সমিতিগুলোকে বিপাকে ফেলতে ওই আইনে আরইবি কিছু ধারা সংশোধন ও সংযোজন করে প্রস্তাব উপস্থাপন করে।

তারা আরো অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে গ্রাহক হয়রানি ও সভার সিদ্ধান্ত না মেনে আমাদের প্রতি প্রহসন, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং আমাদের হয়রানির প্রতিবাদে ১ জুলাই ২০২৪ তারিখ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও গ্রাহক সেবা সচল রেখে পুনরায় কর্মবিরতি শুরু হয়। তদপ্রেক্ষিতে ৫ জুলাই তারিখ বিদ্যুৎ বিভাগে আরইবি, পবিস এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়ায় পুনরায় ১০ জুলাই তারিখ বিদ্যুৎ বিভাগে সভা অনুষ্ঠিত হয়।

পরবর্তীতে জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে আমরা আন্দোলন স্থগিত করি। তখন আমাদের বিএনপি ও জামায়াতের দোসর ও উন্নয়নবিরোধী হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পরেও বারবার আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অসহযোগিতার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। বাধ্য হয়ে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সারাদেশে পল্লী বিদ্যুতের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রাহক সেবা চালু রেখে ৬১ জেলার জেলা প্রশাসকের সামনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি পাঠানো হয়। স্মারকলিপির দাবি ‘জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৫’-এর এজেন্ডা হিসেবে গৃহীত হয় এবং আরইবি-পবিস একীভূত করার দাবিটি যৌক্তিক হওয়ায় মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ হতে বাস্তবায়নের নিমিত্তে বিদ্যুৎ বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হয়।

তারা বলেন, এরপর থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপর আস্থা রেখে আমরা কোনো কর্মসূচি আর দেইনি। কিন্তু ৩০ সেপ্টেম্বরের মানববন্ধনে উদঘাটন হওয়া ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে হঠাৎ করেই ১৬ এবং ১৭ অক্টোবর এই দুই দিনে সমিতির ১৭১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামে রাষ্ট্রবিরোধী ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা ও ২৪ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়। মামলায় মোট ১৬ জনকে আটক এবং রিমান্ডে নেয়া হয়। ৬৩ জনকে ১৭ অক্টোবর পরবর্তী ১ সপ্তাহে সাময়িক বরখাস্তসহ বিভিন্ন শাস্তি দেয়া হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর মধ্যে বিদ্যমান সঙ্কট নিরসনের লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে বারবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বিগত তিন মাসে বদলিকৃত ৪০৭১ জনের প্রায় ৯০ ভাগকে নিজ জেলা হতে ইচ্ছাকৃতভাবে ৪০০/৫০০ কিলোমিটার দূরে পদায়ন করা হয়েছে। এমনকি একজন মৃত ব্যক্তিসহ তিনজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত লাইনক্রুকে বদলি করা হয়েছে। মূলত সংস্কারের কথা বলায় তাদের উপর এহেন দমন-পীড়ন তথা স্বৈরশাসন চালানো হচ্ছে। অনেকে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তৎক্ষণাৎ সাময়িক বরখাস্তসহ সংযুক্তির শিকার হয়েছেন।

বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ যেকোনো মূল্যে এই সঙ্কট নিরসন করতে বদ্ধ পরিকর।