বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গ নিয়ে এক আলোচনা-সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনের প্রতি বাংলাদেশের নীতিকে ‘আপসযোগ্য নয়’ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ‘কোরভ্যালু’র সাথে সম্পৃক্ত বলে মত দেয়া হয়। সেইসাথে বাংলাদেশকে স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে আরো সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান আলোচকরা।
শনিবার (১৭ মে) রাজধানীর তোপখানা রোডের একটি সম্মেলন কক্ষে ‘নীতিগত অবস্থান থেকে চর্চায় রূপান্তর : বাংলাদেশের ফিলিস্তিন নীতির পুনঃপর্যালোচনা’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে আর্গু লজিক্যাল অ্যাক্ট পজিটিভ (এএলএপি) নামের একটি প্রতিষ্ঠান।
এতে আয়োজিত সংলাপে উপস্থিত ছিলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহ আল ইউসুফ (অবসরপ্রাপ্ত), ফিলিস্তিন প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউল কবির দুলু, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ শামসুদ্দীন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সটি অব প্রফেশনালসের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো: আতাউর রহমান তালুকদার, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ওমর নাসিফ আবদুল্লাহ, লেখক ও গবেষক মঈনুল ইসলাম রাকীব, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম মিয়াজী, জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মোসা: মিতু মনি, আলাপের কনভেনর জাকারিয়া পলাশ প্রমুখ।
সংলাপে বিইউপির সহকারী অধ্যাপক মো: আতাউর রহমান তালুকদার বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে এমন একটি মুসলিম দেশ, যার আশেপাশে সব দেশ অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং এসব প্রতিবেশী এলাকায় ক্রমান্বয়ে ইসলামোফোবিয়া বাড়ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে তার মুসলিম বিশ্বের সাথে সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।’
গবেষক মঈনুল ইসলাম রাকীব বলেন, ‘বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে নিজেই আরেকটি ফিলিস্তিন হওয়ার মতো অবস্থানে আছে, যেখানে ভারত একটি নব্য ইসরাইলের ভূমিকায় আছে। এ কারণেই বাংলাদেশকে তার নিজের নিরাপত্তার জন্যই বৈশ্বিক পরিসরে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান জানান দিয়ে যেতে হবে। এর মধ্যে দিয়েই বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিচয় ও সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারবে।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ড. আবদুল্লাহ আল ইউসুফ বলেন, ‘ইসরাইল এবং তার পৃষ্ঠপোষকেরা খুবই শক্তিশালী। একটি সামরিকভাবে কম শক্তিশালী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে এজন্য খুবই কৌশলী হতে হবে। আমাদের অস্ত্রের বিরুদ্ধে গণমাধ্যম ও বয়ান তৈরির মাধ্যমে কাজ করে যেতে হবে। আমাদের তুলে ধরতে হবে যে, হামাস বা ফিলিস্তিনের মানুষেরা সন্ত্রাসবাদী নয়, বরং লিকুদ পারটি বা নেতানিয়াহু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী।’
অতিথির বক্তব্যে ওমর নাসিফ আবদুল্লাহ বলেন, ‘পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হলেও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে বিবদমান সকল পক্ষের স্বার্থ মূলত আদর্শগত। এই আদর্শভিত্তিক অবস্থা আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য আয়ারল্যান্ড, ব্রাজিল, চীনসহ যেসব দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে আছে, সেগুলোকে কৌশলের সাথে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয় ঐক্য নিশ্চিত করতে হবে।’
ফিলিস্তিন প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধা সংসদের চেয়ারম্যান জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি। আমরা আশা করেছি যে, ফিলিস্তিনের জন্যও স্বাধীন দেশ অর্জন করতে হবে। তাই ১৯৮১ সালে আমি ও অনেকে যুদ্ধ করতে গিয়েছি। আমি আমৃত্যু চাইব যাতে ফিলিস্তিন স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার ফিরে পায়।’
সভায় বক্তারা আরো বলেন, ‘বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের নাগরিকদের অনেকে বিভিন্ন ইসরাইলি ব্যক্তির সাথে গোপনে সাক্ষাৎ করছেন এবং অনেকে গোপনে ইসরাইল ভ্রমণ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে কঠোর আইনিব্যবস্থা নেয়ার দাবি করা হয়।’
লিখিত বক্তব্যে আলাপ কনভেনর জাকারিয়া পলাশ বলেন, ‘যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য জাতীয় স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেবলমাত্র অর্থনৈতিক ও ভুখণ্ডের নিরাপত্তার মধ্যেই জাতীয় স্বার্থ সীমাবদ্ধ নয়। বরং রাষ্ট্রের জাতিগত পরিচয় ও দীর্ঘমেয়াদী নীতির সুরক্ষাও রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ বলে বিবেচ্য। সেগুলোও দেশের কোর ভ্যালু যা নন-নেগোশিয়েবল। বাংলাদেশের কোর ভ্যালুর অন্যতম হচ্ছে দমন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং যেকোনো জাতির মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে থাকা। একইভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নেয়াও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এমন একটি কোর ভ্যালু।’
সংলাপে বক্তারা তরুণ প্রজন্মকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান এবং তার ঐতিহাসিক যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পাঠ্যপুস্তকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আলোচনা এবং ফিলিস্তিনের প্রসঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সমর্থন অন্তর্ভুক্তিকরণের জোর দাবি করা হয়।