ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন উদযাপনে আনন্দ মিছিলে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরেছেন ৩৫ বছর বয়সী ঝুট ব্যবসায়ী মো: মনিরুল ইসলাম।

ওই দিন দিবাগত রাতে ঢাকার রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে নেয়ার পর তিনি মারা যান।

মনিরুল ইসলাম ভোলার তজমুদ্দিন উপজেলার শম্ভুপুর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের জয়নাল আবেদিন ওরফে আব্দুল মন্নানের ছেলে।

গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর মনিরও সকলের সাথে আনন্দ মিছিলে যান। দুপুরের দিকে স্ত্রীকে ভিডিও কলে সেই মিছিলের চিত্র দেখিয়েছেন। সন্ধ্যার পরও স্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে।

ওই দিন দিবাগত রাত ২টার দিকে মনিরের স্ত্রীর মোবাইলে এক অপরিচিত লোক কল দিয়ে জানায়, ঢাকার বংশাল থানার সামনে মনির গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এর আধা ঘণ্টা পর আবার কল দিয়ে বলা হয়, হাসপাতালে নেয়ার পর মনির মারা গেছেন। মনিরের পেটে একটি গুলি প্রবেশ করে পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়।

এরপর রাতে ঢাকায় যত আত্মীয় ছিল কারো সাথেই যোগাযোগ করে হাসপাতালে পাঠানো যায়নি। পর দিন ৬ আগস্ট ভোরে মনির মা-বাবা গিয়ে হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে আসেন। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টার দিকে মনিরের লাশ গ্রামের বাড়িতে এনে বাড়ির কাছের মসজিদের পাশের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

পারিবারিক সূত্র জানায়, শহীদ মনির ঢাকার ইসলামপুরে ঝুটের ব্যবসা করতেন। স্ত্রী ও এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করলেও গত এক বছর আগে তাদেরকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। নিজে বংশাল এলাকায় একটি ব্যাচেলর রুম ভাড়া নিয়ে একা থাকতেন।

শহীদ মো: মনিরের স্ত্রী রোজিনা বেগম জানান, ২০১৫ সালে পারিবারিকভাবেই তাদের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাকে ঢাকায় নিয়ে যান মনিরুল। স্বামীর আয়ের টাকায় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তাদের সংসার ভালোভাবেই চলছিল।

কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার ১০ দিনে মাথায় নয় বছর বয়সী ছেলে মো: আবিদ ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে জুনহাসহ স্ত্রী রোজিনা বেগমকে বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয় শ্বশুর বাড়ির লোকজন। স্বামীর টাকায় নির্মাণ করা ভবনে জায়গা হয়নি তাদের।

ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চা দোকানি বাবার ঘরে ঠাঁই হলো শহীদ মনিরের স্ত্রী রোজিনার। সেখানে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।

এদিকে বিভিন্ন সংগঠন থেকে পাওয়া সহায়তার টাকার সমান ভাগও দাবি করছেন শ্বশুর বাড়ির লোকজন।

রোজিনা বেগম জানান, ছোটবেলা থেকেই মনির জীবিকার তাগিদে ঢাকায় চলে যান। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন রকম কাজ করতেন। সর্বশেষ গার্মেন্টসের ঝুটের ব্যবসা শুরু করেন।

এরই মধ্যে গ্রামের বাড়িতে মনির তিন ভাই ও বাবা মিলে একতলা একটি পাকা ভবন করেন। সেই ভবন করার সময় মনির আট লাখ টাকা দিয়েছেন। বিভিন্ন সমস্যার কারণে গত এক বছর আগে ছেলে-মেয়েসহ তাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ছেলে আবিদ স্থানীয় একটি মাদরাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

রোজিনা বেগম আরো জানান, স্বামীর মৃত্যুর দু’দিন পর থেকেই শ্বশুর বাড়ির লোকজন তার সাথে খারাপ আচরণ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে ১০ দিন পর ছেলে-মেয়েকেসহ তাকে ওই বাড়িতে বের করে দেয় শ্বশুর-শাশুড়ি। এরপর ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তার আশ্রয় হয় বাবার বাড়িতেই।

এরই মধ্যে জামায়াতে ইসলামী থেকে দু’লাখ টাকা ও ভোলার জেলা প্রশাসক থেকে ১০ হাজার টাকাসহ মোট দু’লাখ ৬০ হাজার টাকা সহায়তা পান তিনি। ওই টাকার সমান ভাগ দাবি করেন শ্বশুর বাড়ির লোকজন। এটি নিয়ে তারা স্থানীয়ভাবে সালিশ বসিয়েছেন। এরপর ওই টাকা থেকে তাদেরকে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছেন। বাকি টাকা ছেলে-মেয়েদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ব্যাংকে রেখে দিয়েছেন।

রোজিনা বেগম বিলাপের সুরে বলেন, স্বামীর মারা যাওয়ার পর শোক না কাটতেই আমার ছোট ছোট ছেলে মেয়েদেরসহ আমাকে স্বামীর টাকায় নির্মাণ করা ঘর থেকে বের করে দিয়েছে শ্বশুর-শাশুড়ি। এক দিকে স্বামীর শোক অন্য দিকে নিজের ও ছেলে-মেয়ের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বাবার বাড়িতেই আশ্রয় নিই।

সবাই ফেলে দিতে পাররলেও মা-বাবা তো ফেলে দিতে পারে না। তাই চা দোকানি বাবা কয়ছের আহমেদের ঘরেই কষ্টে দিন কাটে আমাদের।

তিনি স্বামী হত্যার বিচারের পাশাপাশি ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তা ও একটু থাকার জায়গার ব্যবস্থা করার দাবি জানান সরকারের কাছে। সূত্র : বাসস