পাবিপ্রবি প্রতিনিধি

জাপান সরকারের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ মেক্সট (মনবুকাগাকুশো) স্কলারশিপ-২০২৬ অর্জন করেছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. রায়হানুল হক (শুভ)। এই বৃত্তির আওতায় তিনি জাপানের ইয়ামানাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মাস্টার্স প্রোগ্রামে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন।

মেক্সট (মনবুকাগাকুশো) স্কলারশিপ জাপান সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রদত্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি বৃত্তি। এটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সরকারি স্কলারশিপগুলোর একটি এবং আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্মানজনক বৃত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই বৃত্তির আওতায় নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, সম্পূর্ণ টিউশন ফি, একাডেমিক ও গবেষণা-সংক্রান্ত ব্যয়, মাসিক উপবৃত্তি, আন্তর্জাতিক বিমান ভাড়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়।

শুভর জাপানের সঙ্গে একাডেমিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় তিনি জাপানের শিমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাকুরা সায়েন্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম-২০২৫-এ অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এই আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণা পরিবেশ, আধুনিক প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর জাপানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের আগ্রহকে আরও দৃঢ় করে।

এই সফরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি মুহূর্ত। শুভ জানান, সাকুরা সায়েন্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের আগে তিনি ইয়ামানাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেক্সট স্কলারশিপের প্রাথমিক বাছাই (প্রাথমিক সাক্ষাৎকার) প্রক্রিয়ায় অংশ নেন। এরপর বাংলাদেশ থেকে জাপানের উদ্দেশ্যে বিমানে ওঠার পর, বিমান উড্ডয়নের ঠিক আগে বিমানের ভেতরে নিজের আসনে বসে তিনি ইয়ামানাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি ই-মেইল পান। সেই ই-মেইলে জানানো হয় যে, তিনি মেক্সট স্কলারশিপের প্রাথমিক বাছাইয়ে সফল হয়েছেন।

সেই মুহূর্তের অনুভূতি প্রকাশ করে শুভ বলেন, “বিমান ছাড়ার ঠিক আগে এমন একটি ই-মেইল পাব, তা কখনো কল্পনাও করিনি। ই-মেইলটি পড়ার পর আনন্দে আমি অভিভূত হয়ে পড়ি। মনে হয়েছিল, আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও স্বপ্ন বাস্তবের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। সেই মুহূর্তটি আজও আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাসহ নির্বাচনের অন্যান্য ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে আমি চূড়ান্তভাবে মেক্সট স্কলারশিপের জন্য মনোনীত হই।”

নিজের এই অর্জন সম্পর্কে মো. রায়হানুল হক (শুভ) বলেন, “সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর প্রতি অশেষ শুকরিয়া। এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার বাবা-মায়ের। তাঁদের ত্যাগ, দোয়া ও ভালোবাসা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে। সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও তাঁরা আমার শিক্ষাজীবনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন, যার ফলেই আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছি।”

তিনি আরও বলেন, “পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক-শিক্ষিকার প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক ড. আব্দুল রহিম স্যার-এর প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। তিনি এবং বিভাগের অন্যান্য শিক্ষক সবসময় আমাকে দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের অনুপ্রেরণা আমার এই পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।”

গবেষণার যাত্রা সম্পর্কে শুভ বলেন, “আমার থিসিস সুপারভাইজার নিতুন কুমার পোদ্দার স্যারের হাত ধরেই গবেষণার জগতে আমার পথচলা শুরু হয়। গবেষণার প্রতিটি ধাপে তাঁর মূল্যবান পরামর্শ, আন্তরিক সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। এছাড়া আমার সকল শিক্ষক, সহপাঠী, বন্ধু, সিনিয়র ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতিও আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সহযোগিতা ও উৎসাহ আমার পথচলাকে সহজ করেছে।”

পড়াশোনার কৌশল সম্পর্কে শুভ বলেন, “আমি কখনো ঘণ্টা গুনে পড়াশোনা করিনি। সবসময় নিয়মিত অধ্যয়ন, ধারাবাহিকতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছি। প্রতিদিন অল্প হলেও নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করেছি। আমার বিশ্বাস, নিয়মিত পরিশ্রম, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা থাকলে সফলতা একদিন অবশ্যই আসে।”

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি গবেষণা, প্রযুক্তি শিক্ষা ও প্রোগ্রামিংয়েও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন শুভ। স্নাতক পর্যায়ে তিনি ৩.৭৮ সিজিপিএ অর্জন করে বিভাগে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। এ পর্যন্ত তাঁর ২১টি আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, কম্পিউটার ভিশন, বায়োইনফরমেটিক্স ও আধুনিক কম্পিউটিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে আসছেন তিনি।

বর্তমানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এর সিএসই বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত আছেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে পাইথন প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিভিন্ন জাতীয় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা আয়োজন, সমস্যা প্রণয়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিং কার্যক্রমের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

প্রযুক্তি শিক্ষা সহজভাবে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি আলগোবাংলা২৯ নামে একটি শিক্ষামূলক ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বাংলা ভাষায় প্রোগ্রামিং, অ্যালগরিদম, কম্পিউটার বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং সফটওয়্যার প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষামূলক ভিডিও প্রকাশ করে আসছেন।

মো. রায়হানুল হক (শুভ)-এর জন্ম রাজশাহী জেলার বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের খাগড়বাড়িয়া গ্রামে। তিনি চকমহাপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং নবাব সিরাজ উদ দৌলা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয়ে সাফল্যের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে শুভ বলেন, “জাপানে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নিজেকে একজন আন্তর্জাতিক মানের গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। ভবিষ্যতে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাদান ও গবেষণার মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই। বিদেশে অর্জিত জ্ঞান, গবেষণার অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেশের শিক্ষার্থী ও গবেষকদের কল্যাণে কাজে লাগানোই আমার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।”

মেক্সট স্কলারশিপের মর্যাদা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “এই বৃত্তি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, এটি একজন শিক্ষার্থীর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার একটি বড় সুযোগ। মেক্সট স্কলারশিপপ্রাপ্তদের পরিচয় জাপানের ভিসাতেও বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। ভিসায় সরকারি স্কলার হিসেবে পরিচয় উল্লেখ থাকে, যা এই বৃত্তির মর্যাদা ও সরকারি স্বীকৃতির একটি বিশেষ দিক।”

উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সাল থেকে জাপান সরকার বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য মেক্সট (মনবুকাগাকুশো) স্কলারশিপ প্রদান করে আসছে। এটি জাপান সরকারের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারি বৃত্তিগুলোর একটি। উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং জাপান ও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান, গবেষণা ও বন্ধুত্বের সেতুবন্ধন তৈরি করাই এই বৃত্তির অন্যতম উদ্দেশ্য।