বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববাদ্যায়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে পরিবেশ বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মুরাদ আহমেদ ফারুক বলেছেন, ইটভাটায় পরিবেশবান্ধব চিমনি স্থাপন করা হলে ৫৮ শতাংশ বায়ু দূষণ কমে আসবে। দেশে প্রায় সাড়ে আট হাজার ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটায় পরিবেশ বান্ধব কার্বন পিউরিফিকেশন প্লান্ট ব্যবহারের ফলে বায়ুমণ্ডলে দূষণ কমবে ৫৮ শতাংশ।
তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সয়েল ইকোলজি অ্যান্ড ফার্টিলিটি’ ল্যাবে পরীক্ষায় দেখা গেছে। পরিবেশবান্ধব চিমনি ব্যবহারে সেই সব ইটভাটার প্রথম ধাপের চেম্বারের ধোয়ায় পাওয়া নমুনায় দূষিত ক্ষুদ্রবস্তু কনার পরিমার পিএম ২ দশমিক ৫ সমান ৩১৪ মিলিগ্রাম/লিটার।
আর প্রথম ধাপের সাকনির পর সেই ধোয়ায় পাওয়া গেছে ২৩৭ পিপিএম ক্ষুদ্র বস্তিকণা। পর্যায়ক্রমে আট চেম্বার বা পানি ফিলটার দিয়ে বিশুদ্ধ হয়ে আধুনিক চিমনি দিয়ে বের হওয়া সাদা ধোয়া থেকে বের হচ্ছে মাত্র ৩২ মিলিগ্রাম পার লিটার।
তিনি আরো জানান, ল্যাব পরীক্ষায় দেখা গেছে, পুরাতন চিমনিতে প্রথম ধাপে ৭৪৭ মিলিগ্রাম/লিটার মিথেন গ্যাস নির্গত হতো। সেখানে আট চেম্বারের ফিল্টারিং করার পর ৯০ শতাংশ মিথেন গ্যাস নির্গমন হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে পুরাতন চিমনি দিয়ে যেখানে ১১ হাজার ৮২২ পিপিএম কার্বন ডাই অক্সাইড বের হতো সেখানে আধুনিক চিমনি দিয়ে বের হচ্ছে মাত্র ৩ হাজার ৭৭৬ পিপিএম অর্থাৎ ৩২ শতাংশ কম।
অন্যদিকে নাইট্রাস অক্সাইড প্রথমে বের হত সাত পিপিএম আর আধুনিক চিমনি দিয়ে বের হচ্ছে মাত্র তিন পিপিএম অর্থাৎ ৫০ শতাংশের বেশি নাইট্রাস অক্সাইড কম বের হচ্ছে। উপরোক্ত তিনটি উপাদান বায়ু মণ্ডলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিবেশবান্ধব চিমনি স্থাপনের পরামর্শ দেন তিনি।
সরেজমিন দেখা গেছে, দেশের অধিকাংশ ইটভাটায় এখনো মান্ধাতার আমলের চিমনি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব চিমনি দিয়ে কালো ধোয়া নির্গত হয়। এতে মারাত্মকভাবে দূষিত হয় বাতাস। যা জীবনের জন্য হুমকি ও বিপর্যয়কর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বায়ুমণ্ডলে। এজন্য মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।
বাকৃবির গবেষণায় জানা গেছে, ইটভাটার কালো ধোয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই ধোয়ায় মিথেন গ্যাস, দূষিত কার্বন ডাই অক্সাইড এবং নাইট্রাস অক্সাইড নামক তিনটি ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। যা শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের রোগ, অ্যালার্জি ও অন্য স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। শিশুদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
কারণ শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। পরিবেশ বিপর্যয়রোধে পরীক্ষামূলকভাবে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার কুষ্টিয়া নামাপাড়ায় একটি ইট ভাটায় স্থাপন করা হয় কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনলজি’র (সিপিটি) কার্বন পিউরিফিকেশন প্লান্ট। এই প্লাট স্থাপনে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও উৎপাদন খরচ কমেছে।
২০২০ সালে পরিবেশ বান্ধব ওই প্লান্টের উদ্ভাবক আলী হোসেন প্রকল্পটির পাইলটিং শুরু করেন। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ‘এবিসি ব্রিকস’র মালিক রুহুল আমিন দু’একরের একটি ভাটায় ওই প্ল্যান্ট স্থাপন করেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইটভাটায় দু’টি চিমনি। একটি মান্ধাতার আমলের অন্যটি পরিবেশবান্ধব। মান্ধাতার আমলের চিমনিটি এখন ব্যবহৃত হচ্ছে না। আধুনিক চিমনি দিয়ে বের হচ্ছে পরিবেশবান্ধব সাদা শীতল বাষ্প। এটি মূলত: আট চেম্বার বিশিষ্ট আন্ডার গ্রাউন্ড একটি পানি প্রবাহ বা ওয়াটার স্প্রে চ্যানেল। যে চ্যানেল দিয়ে কার্বন মিশ্রিত কালো দূষিত পানি ওয়াটার স্প্রে চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে থাকে। ফলে কালো ধোয়ার পরিবর্তে আধুনিক চিমনি দিয়ে সাদা ও শীতল বাষ্প বের হয়ে মিশে যাচ্ছে বায়ুমণ্ডলে।
অন্যদিকে কার্বন মিশ্রিত পানি ফিল্টারের মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে একটি চৌবাচ্চায় জমা হচ্ছে কার্বনের গাদ। সে গাদ আহরণ করে পুনরায় ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। তাতে উৎপাদন খরচ কমেছে।
পরিবেশবান্ধব চিমনির উদ্ভাবক আলী হোসেন জানান, বাণিজ্যিকভাবে কার্বন পিউরিফিকেশন প্লান্ট বাজারজাত করে মুনাফা অর্জন উদ্দেশ্য নয়। পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তি কার্বো-পিউরিফিকেশন টেকনোলজি (সিপিটি) শিল্প কলকারখানায় ও ইট ভাটায় স্থাপন করলে কারখানার নির্গত কালো ধোঁয়া ওয়াটার স্প্রে প্লান্ট এর মাধ্যমে ফিল্টারিং করে জিরো কার্বনে বায়ু দূষণমুক্ত সাদা শীতল বাষ্প পরিবেশবান্ধব নতুন চিমনি দিয়ে ছাড়া হবে। তাতে কারখানার নির্গত বায়ু দূষণের মাত্রা সহনীয় থাকবে। সিপিটি স্থাপনের কারণে কারখানাগুলোও পরিবেশবান্ধব হবে এবং নির্গত কালো ধোঁয়ার ক্ষতিকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে জনসাধারণ মুক্তি পাবে। কৃষির কোনো ক্ষতি হবে না। পশু পাখির বাসস্থান ঠিক থাকবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের কবল থেকে দেশ ও জাতি রক্ষা পাবে এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন পূরণ হবে।