৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারতলা ভবন। ঝকঝকে টাইলস, ১২টি কক্ষ, আইপিএস ও পানি সরবরাহ—আধুনিক জীবনযাপনের প্রায় সব সুবিধাই রয়েছে সেখানে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সেই ভবনেই বসবাস করেন বড় ছেলে। কিন্তু সেই ভবনের সামনেই আরেকটি দৃশ্য—যা শুধু অমানবিক নয়, সভ্য সমাজের জন্যও চরম লজ্জার।

ঝোপঝাড়ের আড়ালে ছোট্ট একটি টিনের ঘর। সেই ঘরের বারান্দায় পড়ে আছেন ৮০ বছরের বৃদ্ধা মা মেহেরুন্নেছা। তার ডান পায়ে মোটা লোহার শিকল। শিকলের অপর প্রান্ত বাঁধা ঘরের খুঁটির সাথে। অভিযোগ, প্রায় এক বছর ধরে এভাবেই বন্দি জীবন কাটছে তার।

ঘটনাটি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার রাজগাতি ইউনিয়নের উলুহাটি মাইজপাড়া গ্রামের। একই বাড়ির এক পাশে অট্টালিকা, অন্য পাশে শিকলবন্দি মা—দৃশ্যটি যেন সম্পদ আর মানবিকতার নির্মম বৈপরীত্য।

‘পাগল’ বলে শিকলে বাঁধা :
মেহেরুন্নেছার পুত্রবধূ গেনেদা বেগমের দাবি, তার শাশুড়ি মানসিকভাবে অসুস্থ। প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ নেই। কোথাও চলে যেতে পারেন—এই আশঙ্কায় তাকে শিকল দিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।কিন্তু সরেজমিনে বৃদ্ধার শারীরিক অবস্থা দেখলে এ যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মেহেরুন্নেছা ঠিকমতো হাঁটতেও পারেন না।

স্থানীয়দের ভাষ্য, লাঠিতে ভর দিয়ে বড়জোর দু’এক কদম হাঁটতে পারেন তিনি। নিজে উঠে দাঁড়ানোই যেখানে কঠিন, সেখানে ‘হারিয়ে যাওয়ার ভয়’ দেখিয়ে একজন বৃদ্ধাকে প্রায় এক বছর শিকলে বেঁধে রাখা কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে পরিবারকেই।

সম্পত্তির ভাগের পর মায়ের ঠাঁই টিনের ঘরে :
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, মেহেরুন্নেছার স্বামী মৃত আব্দুস সামেদ ভূঁইয়ার মৃত্যুর পর থেকেই তার জীবন বদলে যায়। পরে জমিজমা ও সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে সন্তানদের সাথে বিরোধ তৈরি হয়।

তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে নিজেদের সম্পত্তির ভাগ বুঝে নিয়ে তা বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন বলে স্থানীয়রা জানায়।

বড় ছেলে ইকবাল হোসেন ঢাকায় ব্যবসা করেন। গ্রামের বাড়ির চারতলা ভবনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তার বসবাস। কিন্তু সম্পত্তি ভাগের পর মায়ের ভাগ্যে জোটে না সেই ভবনের একটি কক্ষও। তার ঠাঁই হয় বাড়ির সামনের পরিত্যক্ত টিনের ঘরে। আর এখন সেই ঘরের খুঁটির সাতে বাঁধা তার পা।

সাংবাদিক দেখেই মুখ চেপে ধরলেন পুত্রবধূ :
রোববার (৯ আগস্ট) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ময়লা কাপড় পরা মেহেরুন্নেছা টিনের ঘরের বারান্দায় পড়ে আছেন। শরীরজুড়ে অসহায়ত্বের ছাপ। ডান পায়ে মোটা শিকল। কাছে গিয়ে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলে তিনি নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকেন। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।

কথা বলার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে পুত্রবধূ গেনেদা বেগম দ্রুত তার সামনে গিয়ে বৃদ্ধার মুখ চেপে ধরেন এবং মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেন। একজন বৃদ্ধা মায়ের মুখ বন্ধ করার এই দৃশ্য উপস্থিতদেরও নাড়া দেয়।

১২ কক্ষের বাড়িতে মায়ের জন্য একটি জায়গাও নেই? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখানেই। একটি চারতলা ভবন। ১২টি কক্ষ। আধুনিক সুবিধা। সেখানে পরিবারের সদস্যরা স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছেন। অথচ একই পরিবারের ৮০ বছরের বৃদ্ধা মা থাকছেন ঝোপঝাড়ের মধ্যে টিনের ঘরে। শুধু তা-ই নয়, অভিযোগ অনুযায়ী তার পায়ে বাঁধা হয়েছে শিকল।

প্রশ্ন হচ্ছে—প্রস্রাব-পায়খানার সমস্যা থাকলে একজন বৃদ্ধার চিকিৎসা ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা যায় না?

হাঁটাচলায় অক্ষম হলে একজন স্বজন তার পাশে থাকতে পারেন না? নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে ঘরের ভেতরে নিরাপদ ব্যবস্থা করা যায় না? নাকি মায়ের জন্য পরিবারের কাছে একটি শিকলই সবচেয়ে সহজ সমাধান?

ছেলের বক্তব্য মেলেনি :
ঘটনার বিষয়ে বড় ছেলে ইকবাল হোসেনের বক্তব্য জানতে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।

তার স্ত্রী জানান, ইকবাল পাশের বাজারে গেছেন। পরে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে মাকে শিকল দিয়ে রাখার অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসন বলছেন, ‘অমানবিক’ :
ঘটনার বিষয়ে নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক ও অমানবিক। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

প্রশাসনের এই বক্তব্যের পর এখন প্রশ্ন—কবে হবে সেই ‘খোঁজ’? বৃদ্ধা মেহেরুন্নেছাকে শিকলমুক্ত করে নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা দেয়ার ব্যবস্থা কবে হবে?

একজন ৮০ বছরের নারী যদি সত্যিই মানসিকভাবে অসুস্থ হন, তাহলে তার প্রয়োজন চিকিৎসা ও পরিচর্যা—শিকল নয়। আর যদি তিনি চলাচলেই অক্ষম হয়ে থাকেন, তাহলে ‘হারিয়ে যাওয়ার ভয়’ দেখিয়ে তাকে বন্দি রাখার যুক্তি আরো প্রশ্নবিদ্ধ।

৬০ লাখ টাকার অট্টালিকা দাঁড়িয়ে আছে মায়ের চোখের সামনেই। অথচ সেই অট্টালিকায় মায়ের জন্য জায়গা নেই। আছে শুধু বাড়ির সামনে একটি টিনের চালা, একটি খুঁটি আর সেই খুঁটির সাথে বাঁধা একটি শিকল।

এ শিকল শুধু একজন বৃদ্ধার পায়ে নয়—এটি আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধ, সন্তানের দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার গায়েও প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।