ক্রীড়া প্রতিবেদক, চেন্নাই থেকে
আর্জেন্টাইন ফুটবলের পরিচিত মুখ লাউতারো মার্টিনেজকে চেনে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু হকিতে তার নামে আরেক লাউতারো- যদিও তিনি ফুটবলার নন, তবু নামের মিল নিয়ে সতীর্থদের কাছে প্রায়ই ঠাট্টার শিকার হন। একদিন মজা করে এক খেলোয়াড় বলেই ফেলেছিলেন, ‘দলে যখন লাউতারো আছে, মেসি কেন নেই?’ সেই কথাতেই হাসির রোল পড়ে ড্রেসিং রুমে। লাউতারো নিজেও ঠাট্টাটা বেশ উপভোগ করেন।

পরে হেসে বলেন, ‘মেসির তুলনা মেসি নিজেই। ফুটবলে তার পায়ের জাদু পৃথিবীকে মোহিত করলেও হকিতে স্টিকের জাদুতে তার মতো হবে- এটা ভাবাও কঠিন। আমরা জুনিয়ররা শুধু চেষ্টা করি টিম হিসেবে এক নম্বরের শক্তি হতে। ফুটবলের লাউতারোর নামের যেন অমর্যাদা না হয়, সেটিই চেষ্টা থাকবে হকির লাউতারোর। এই বিশ্বকাপে ট্রফি জেতাই হবে সেই চেষ্টার মূল অর্থ।’

আর্জেন্টিনা হকিতে কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা যায় তাদের ইতিহাস দেখলেই। আমেরিকা মহাদেশের একমাত্র দল হিসেবে অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয়ের অনন্য কৃতিত্ব রয়েছে লিওনসদের। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ফাইনালে বেলজিয়ামের মতো শক্তিশালী দলকে ৪-২ গোলে হারিয়ে অর্জন করেছিল সেই সাফল্য।

কোচ কার্লোস রেতেগুইয়ের হাত ধরেই হকি দুনিয়ায় নতুন উচ্চতায় ওঠে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের মঞ্চেও আর্জেন্টিনা নিয়মিত দল। ১৯৭৩ সালের প্রথম আসর থেকে ১৯৯৮ ছাড়া প্রতিটি টুর্নামেন্টেই তাদের উপস্থিতি। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে ব্রোঞ্জ পদকই তাদের সর্বোচ্চ অর্জন। এছাড়া ২০০৮ সালের হকি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে ব্রোঞ্জ এবং ২০১৬-১৭ হকি ওয়ার্ল্ড লিগে রৌপ্য পদক জিতে নিজেদের শক্তির জানান দেয় লাতিন আমেরিকার এই দলটি।

এই অঞ্চলে আর্জেন্টিনার আধিপত্য প্রায় অপ্রতিরোধ্য। প্যান আমেরিকান কাপে চারটি স্বর্ণপদক এবং প্যান আমেরিকান গেমসে এগারোটি স্বর্ণই বলছে তাদের সাফল্যের গল্প। ২০১৫ সালের নভেম্বরে যখন তাদের বিশ্ব র‌্যাঙ্কিং পঞ্চম স্থানে ওঠে, তখনই ধারণা করা হয়েছিল- এই দল আরো এগোবে। ২০১৭ সালে অলিম্পিক স্বর্ণ জয় করে সত্যিই তারা উঠে আসে বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বরে।

জুনিয়র পর্যায়েও আর্জেন্টিনার দাপট কম নয়। জুনিয়র র‌্যাঙ্কিংয়ে তারা বর্তমানে তৃতীয় স্থানে- জার্মানি ও ভারতের ঠিক পরেই। অন্য দিকে বাংলাদেশ রয়েছে ২০তম স্থানে। তবে অবস্থান কুড়িতে হলেও আমিরুল ইসলামদের পারফরম্যান্স বাংলাদেশকে বিশ্ব হকিতে নতুন উচ্চতায় তুলে ধরছে। মাত্র পাঁচ মাসের প্রস্তুতি, ২০টির মতো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে। তাতে বিশ্বকাপ মঞ্চে যে দাপট দেখিয়েছে এই দল, তাতে বোঝাই যায়- বছরজুড়ে অনুশীলন করলে তারা আরো অনেক উঁচুতে যাবে। বাংলাদেশের হকির উন্নতির এই গল্প ইতোমধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে বিভিন্ন দলের খেলোয়াড়দের মুখেও।

আর্জেন্টাইন লাউতারোও ছিলেন সেই তালিকায়। স্টেডিয়ামে বসে দেখেছেন বাংলাদেশ দলের দুটি ম্যাচ। তার অভিজ্ঞতা শুনলে বোঝা যায়- বাংলাদেশ তাকে সত্যিই অবাক করেছে। তিনি বলেন, ‘গ্রুপ দেখে বাংলাদেশের নাম জেনেছিলাম। বাংলাদেশ যে হকি খেলে, সেটা সত্যিই জানতাম না। ফুটবলে তোমরা মেসিকে ভালোবাসো, আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের ভক্ত- এটা জানতাম। কিন্তু হকিতে এত ভালো খেলো, তা সত্যিই জানা ছিল না।’

বিশেষ করে মুগ্ধ হয়েছেন আমিরুল ইসলামের পেনাল্টি কর্নার বা পিসি নেয়ার নিপুণতায়। লাউতারোর ভাষায়, ‘তোমাদের যে ছেলেটা পিসি নেয়, সে সত্যিই দারুণ। বলের গতি আর নিয়ন্ত্রণ-অসাধারণ।’

কোরিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচও চমকে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘ম্যাচের প্রথম দুই কোয়ার্টার দেখে চলে এসেছিলাম। মনে হয়েছিল বাংলাদেশ হারবে। পরে শুনলাম ড্র করেছে। অবাক হয়েছি সত্যি। তোমরা হারলেও লড়াই করেছ, সেটা বোঝা গেছে।’

বাংলাদেশ সম্পর্কে তার মন্তব্যের শেষে তিনি জানালেন শুভকামনা, ‘বাংলাদেশ ভালো খেলছে। উন্নতি করছে। তোমাদের জন্য শুভকামনা রইল।’

আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বমানের দলের খেলোয়াড় যখন বাংলাদেশের পারফরম্যান্সকে সম্মান জানায়, তখন বোঝাই যায়- বাংলাদেশ হকি নতুন দিনে পা রেখেছে। পরিশ্রম আর পরিকল্পনা থাকলে এই দল আরো উচ্চতায় পৌঁছবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।