বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকরা দীর্ঘ ১৫ বছরের নিরলস গবেষণায় সফলভাবে একটি নতুন রঙিন গোশত উৎপাদনকারী মুরগির উপজাত উদ্ভাবন করেছেন।
প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি) এর অর্থায়নে পরিচালিত এ গবেষণায় উদ্ভাবিত স্বতন্ত্র উপজাতের এ মুরগি দ্রুত বর্ধনশীল। এর গোশত দেশী মুরগির মতো শক্ত। তবে গোশতের রঙ লালচে।
বুধবার বিকেল সোয়া ৫টায় বিষয়টি জানান নতুন জাত উন্নয়নে গবেষণা দলের নেতৃত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: বজলুর রহমান মোল্যা।
এর আগে মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের সেমিনার কক্ষে ভিসি অধ্যাপক ড. এ. কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া এবং পোলট্রি বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো: শওকত আলীসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এ গবেষণাটির চূড়ান্ত ফলাফল তুলে ধরা হয়।
অধ্যাপক ড. মো: বজলুর রহমান মোল্যা জানান, ভোক্তার চাহিদা ও খামারিদের অর্থনৈতিক লাভের কথা মাথায় রেখে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক ধরে বিভিন্ন প্যারেন্ট লাইন সংরক্ষণ, নির্বাচন ও সংকরায়ণের মাধ্যমে এ নতুন লাইন উন্নয়ন করা হয়েছে। দেশীয় স্বতন্ত্র উপজাতের এ মুরগি দেশীয়ভাবে উৎপাদন করলে সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা।
তিনি জানান, গবেষণায় সেক্স-লিংক হোয়াইট লাইনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বর্তমানে এর সমজাতীয়তা বা হোমোজাইগোসিটি ৮৯ থেকে ৯৩.১১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যা একটি স্থায়ী উপজাত হিসেবে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া মুরগির পালকের রঙ নির্ধারণকারী এসওএক্স-১০ জিনের ডিলিশন শনাক্তে একটি সহজ পিসিআর পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। যা ভবিষ্যৎ প্রজনন কর্মসূচিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিজ্ঞানীরা জানান, উপজাতটির কিছু প্যারেন্ট লাইন ৬২ সপ্তাহে প্রায় ২০৫টি পর্যন্ত ডিম উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া প্রচলিত সোনালি মুরগির একদিন বয়সী বাচ্চার ওজন যেখানে সাধারণত ২৬ থেকে ২৮ গ্রাম হয়, সেখানে নতুন উদ্ভাবিত সংকর লাইনে বাচ্চার ওজন পাওয়া গেছে প্রায় ৩৮ গ্রাম। একদিন বয়সী বাচ্চার ওজনে প্রতি এক গ্রাম বৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব বাজারজাতকরণের সময় প্রায় ৫০ গ্রাম অতিরিক্ত চূড়ান্ত ওজনে প্রতিফলিত হয়। যা খামারিদের বাড়তি মুনাফা নিশ্চিত করবে। এ ছাড়াও মাত্র ৪৫ দিনে এই মুরগির ওজন হবে ৯৫০ গ্রাম।
তারা আরো জানান, এ গবেষণা প্রকল্পের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি হস্তান্তর। প্রথাগত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সীমাবদ্ধতা দূর করতে গবেষণা দল সরাসরি বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে ১৫ থেকে ২৫ জনের ক্লাস্টারভিত্তিক নারী খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের ফলাফলে দেখা গেছে, যেসব খামারিকে বাচ্চার পাশাপাশি নিয়মিত কারিগরি সহায়তা, সঠিক সময়ে টিকা প্রদান এবং স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে, তাদের খামারে মুরগির বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
এ ছাড়া খাদ্য রূপান্তর দক্ষতা উন্নত হয়েছে এবং মৃত্যুহার হ্রাস পেয়েছে। বাজার চাহিদার কারণে অনেক খামারি নির্ধারিত ৫০ দিনের পরিবর্তে ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত এই মুরগি পালন করছেন এবং প্রতি কেজি ৭০০ টাকা পর্যন্ত উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন।
ভোক্তা অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে ড. মোল্যা জানান, ঢাকার একটি উন্নত গবেষণাগারে এই মুরগির গোশত পরীক্ষা করে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। বাজারে দেশী মুরগির নামে চালিয়ে ক্রেতা প্রতারণার কোনো সুযোগ থাকবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, দেশী মুরগির নাম ভাঙানো নয়, বরং উন্নত স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও শতভাগ নিরাপদ গোশতের নিশ্চয়তা দিয়ে এটিকে বাজারে একটি স্বতন্ত্র রঙিন গোশতের ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
এ বিষয়ে আলাপকালে উদ্ভাবনটির মাঠপর্যায়ে প্রসারের ওপর জোর দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. এ.কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, শুধু ল্যাবরেটরিতে জাত বা উপজাত উদ্ভাবন করলেই হবে না। সেই সব প্রযুক্তি ও সুফল খামারিদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়াই এ প্রকল্পের মূল দর্শন। এর মাধ্যমে খামারিরা লাভবান হবেন এবং দেশের নিরাপদ প্রাণিজ প্রোটিন উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিসম্পদ অনুষদের বন্ধ থাকা বিক্রয় কেন্দ্রটি দ্রুত চালুর নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব গবেষণায় উৎপাদিত দুগ্ধ, গোশত ও পোলট্রিজাত সব পণ্য সরাসরি এ বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে সুলভ মূল্যে পৌঁছে দিতে হবে।
গবেষণাটির চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও পোলট্রি খাতের উদ্যোক্তারা। পরে নতুন উদ্ভাবিত এই মুরগির গোশত দিয়ে প্রস্তুত করা বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয়। সূত্র : বাসস