জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র থাবায় কফিপ্রেমীদের জন্য আসছে এক চরম দুঃসংবাদ। বিশ্বজুড়ে কফি গাছ এখন মারাত্মকভাবে বিপন্ন। বিজ্ঞানীদের প্রিয় এই ‘জ্বালানি’ বা উদ্দীপকের সরবরাহ ঠিক রাখতে গবেষকেরা দিনরাত সমাধান খুঁজছেন। আলবেয়ার কামুর সেই বিখ্যাত উক্তি— ‘আমার কি আত্মহত্যা করা উচিত, নাকি এক কাপ কফি খাওয়া উচিত?’ অথবা পরলোকগত হাঙ্গেরিয়ান গণিতবিদ পাভেল অরডসের কথা— ‘গণিতবিদ হলেন এমন এক যন্ত্র, যা কফিকে গাণিতিক উপপাদ্যে রূপান্তর করে’— এসবই প্রমাণ করে মানুষের জীবনে কফি কতটা জড়িয়ে আছে। তবে এই পানীয়ের ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তায়।
‘নেচার’ সাময়িকীকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আদ্দিস আবাবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ জিনতত্ত্ববিদ কাসাহন টেসফায়ে বলেন, কফি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে। ইরানের ছাত্র সংবাদ সংস্থা ইসনা বুধবার (১ জুলাই) এই তথ্য জানিয়েছে।
ইতিহাসে কফি নিয়ে রয়েছে নানা বিচিত্র কাণ্ড। ১৬ শতকে কফি যখন প্রথম ইউরোপে প্রবেশ করে, তখন যাজকেরা একে ‘শয়তানের তিতা পানীয়’ বলে নিষিদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত পোপ অষ্টম ক্লেমেন্ট নিজে এক কাপ কফি খেয়ে এর স্বাদে মুগ্ধ হন এবং একে ‘পবিত্র করে’ খ্রিস্টানদের পানীয় বানিয়ে নেন।
বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ বাখ কফি ভালোবেসে ‘কফি ক্যানটাটা’ নামের আস্ত একটি গানই লিখে ফেলেন, যেখানে তিনি কফিকে হাজার চুম্বনের চেয়েও মিষ্টি বলেছেন। দিনে ৪০ থেকে ৫০ কাপ কফি খাওয়া ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারকে ডাক্তার যখন বলেন কফি একটি ‘ধীর গতির বিষ’, ভলতেয়ার হেসে বলেছিলেন, ‘দীর্ঘ ৮০ বছর ধরে আমি এটা খেয়ে আসছি, অথচ এখনো মরলাম না!’ কফি ছাড়া লিখতে না পারা ফরাসি লেখক অনোরে দ্য বালজাকও দিনে প্রায় ৫০ কাপ কফি খেতেন।
কফি নিয়ে কিছু মজার সত্য হলো— কফি আসলে বীজ নয়, এটি চেরি ফলের বীজ হওয়ায় এক ধরনের ফলের রস। লোকগাথা অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার এক রাখাল প্রথম খেয়াল করে যে তার ছাগলগুলো এক ধরনের বুনো বেরি খাওয়ার পর অদ্ভুত নাচানাচি করছে। সেখান থেকেই কফির শক্তির হদিস মেলে। এমনকি ১৫ শতকের কনস্টান্টিনোপলে স্বামী স্ত্রীকে প্রতিদিন পর্যাপ্ত কফি না দিলে স্ত্রী চাইলে স্বামীকে আইনিভাবে তালাক দিতে পারতেন।
বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর যে ১ কোটি টন কফি দানা ব্যবহার করা হয়, তার প্রায় পুরোটাই আসে দুটি প্রজাতি থেকে; তীব্র ও তেতো স্বাদের ‘রোবাস্টা’ এবং মৃদু স্বাদের ‘অ্যারাবিকা’। কিন্তু তাপমাত্রা মাত্র কয়েক ডিগ্রি বাড়লেই অ্যারাবিকা নষ্ট বা মরে যায়।
অন্যদিকে রোবাস্টার জন্য প্রচুর পানি লাগে এবং খরায় এর উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যায়। এই অবস্থায় কফি ভোক্তাদের জাগিয়ে রাখতে এবং দরিদ্র চাষিদের জীবিকা বাঁচাতে গবেষকেরা নানা কৌশল খাটানো শুরু করেছেন।
অ্যারাবিকার আদিভূমি ইথিওপিয়ার সরকার এর প্রাকৃতিক জিনগত বৈচিত্র্য রক্ষায় সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করছে। আদ্দিস আবাবার ইথিওপিয়ান বায়োডাইভারসিটি ইনস্টিটিউট এবং জিম্মার ইথিওপিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ১২ হাজারেরও বেশি অ্যারাবিকা গাছ সংগ্রহে রাখা হয়েছে, যা উচ্চ তাপমাত্রা ও খরা সহনশীল নতুন জাতের কফি তৈরিতে জিনগত উপাদান জোগাবে।
টেসফায়ে জানান, অ্যারাবিকার কোষে চার সেট ক্রোমোজোম থাকে। প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে দুটি প্রজাতির প্রাকৃতিক সংকরায়নে এর জন্ম। তিনি আশাবাদী যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার মতো পর্যাপ্ত জিনগত বৈচিত্র্য তাদের সংগ্রহে আছে।
লন্ডনের রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনসের গবেষক ডেভিস ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগ থেকে আফ্রিকার বিভিন্ন বনাঞ্চলে ও হার্বেরিয়ামে বুনো কফির জাত খুঁজে বেড়াচ্ছেন। তিনি ও তার সহকর্মীরা মিলে এ পর্যন্ত জানা কফি প্রজাতির প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বৈজ্ঞানিক বিবরণ দিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল ঘুরে ডেভিস দেখেছেন, চাষিরা অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ে চাষের জাত বদলে ফেলছেন। আর্দ্র অঞ্চলে চাষিরা অ্যারাবিকা ছেড়ে রোবাস্টা ধরছেন, আবার কোথাও লিবেরিকা কফি চাষ করছেন যা উচ্চ তাপমাত্রা সইতে পারে এবং পানি কম লাগে। তবে কফি শিল্প এই বুনো জাত নিয়ে এতদিন সন্দিহান ছিল।
সম্প্রতি ডেভিস তার অফিসে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী কফির স্বাদ পরীক্ষা করেন। মালয়েশিয়ার লিবেরিকা কফিতে কাঁঠাল ও আমের মতো ক্রান্তীয় ফলের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। পশ্চিম আফ্রিকার রাসেমোসায় রয়েছে চকোলেটের কড়া গন্ধ, যা কারো খুব পছন্দ আবার কারো অপছন্দ হতে পারে। তবে দক্ষিণ সুদানের ‘এক্সেলসা’ এবং লিবেরিকা ও এক্সেলসার একটি হাইব্রিড জাতের স্বাদ ও সুগন্ধ অ্যারাবিকার মতোই চমৎকার।
এমনকি কফি বিশেষজ্ঞরা ও সাধারণ ভোক্তারাও এর পার্থক্য ধরতে পারেন না। এগুলো বেশ শক্তপোক্ত গাছ। ডেভিস পশ্চিম আফ্রিকায় অষ্টাদশ শতকের দিকে আবিষ্কৃত ও পরে হারিয়ে যাওয়া ‘স্টেনোফিলা’ নামের একটি জাতও পরীক্ষা করে দেখেছেন, যা রুয়ান্ডার বিশেষ অ্যারাবিকার মতো স্বাদযুক্ত এবং চরম বৈরী পরিবেশেও টিকে থাকে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এর উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
এদিকে, ওরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার হেনডন কফির অপচয় কমাতে ব্যবহারকারী পর্যায়ে কিছু রাসায়নিক কৌশলের কথা বলেছেন। তার দল দেখেছে, হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রায় কফি দানা গুঁড়ো করলে কণাগুলো ছোট হয়। তবে কণা বেশি ছোট হলে স্থির বৈদ্যুতিক বলের কারণে পানির উপরিভাগে দলা পাকিয়ে যায় এবং কফির ভেতরের উপাদান ঠিকঠাক পানিতে মেশে না। কফি দানা কিছুটা ভেজানোর পর গুঁড়ো করলে এই সমস্যা কমে। এ ছাড়া কিছুটা মোটা দানার গুঁড়ো থেকে ৭ বায়ুমণ্ডলীয় চাপে এসপ্রেসো বানালে আরো ভালো নির্যাস পাওয়া যায়। কফির স্বাদকে সংখ্যার মানে প্রকাশ করা বড় চ্যালেঞ্জ। এক কাপ কফিতে ২ হাজারেরও বেশি জৈব যৌগ থাকতে পারে। এই সংখ্যা কফি চাষের স্থান এবং কফি দানা ভাজার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
টেসফায়ে বলেন, বিজ্ঞানীদের নিজেদের স্বার্থেই কফির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবা উচিত। কারণ বিজ্ঞান যেমন কফির জন্য ভালো, তেমনি কফিও বিজ্ঞানের জন্য দারুণ উপকারী। বিশ্বের বহু আবিষ্কার আর জ্ঞানচর্চার জন্ম হয়েছে মূলত এক কাপ কফিতে চুমুক দেয়ার পরেই।