স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে হজ প্রশাসন নিশ্চিত হবে হজযাত্রীদের সর্বোত্তম সেবা

Printed Edition

হজের ফজিলত সম্পর্কে রাসূল সা: বলেন ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করল এবং এ সময় অশ্লীল ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে।’

- সহিহ বুখারি : ১৫২১

কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ)

মন্ত্রী, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়

হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ ও ফরজ ইবাদত। যেসব মুসলিম নরনারীর শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি আর্থিক সঙ্গতি রয়েছে, তাদের জন্য জীবনে একবার হজ পালন ফরজ।

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯১ শতাংশ মুসলমান। মুসলিম জনসংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বে আমাদের অবস্থান চতুর্থ। সর্বাধিক হজযাত্রী প্রেরণকারী দেশের তালিকায়ও সারা বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

ফরজ ইবাদত হওয়ার পাশাপাশি হজের অত্যধিক গুরুত্ব ও ফজিলতের কারণে প্রত্যেক ঈমানদার মুসলমান হজ পালনের তীব্র আকাক্সক্ষা লালন করেন। অনেকে হজের ব্যয় মেটানোর জন্য কষ্টার্জিত অর্থ থেকে তিলে তিলে সঞ্চয় করেন। কেউ কেউ জমিজমা বিক্রি করে কিংবা শেষ বয়সের সম্বলটুকু উজাড় করেও হজ পালন করে থাকেন। মুমিনদের ঐকান্তিক ইচ্ছা হলো- মহান আল্লাহ পাকের হুকুম পালনের মাধ্যমে নিষ্পাপ হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া।

সরকার এ দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবশ্যকীয় ইবাদত ও ধর্মীয় আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে হজের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি সংযোজন করেছে। ‘সাশ্রয়ী, মানবিক ও প্রবাসীবান্ধব হজব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা’ -সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। ইতোমধ্যে সরকারের এই নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

হজব্যবস্থাপনা একটি সময়াবদ্ধ কার্যক্রম। সৌদি সরকার কর্তৃক ঘোষিত হজব্যবস্থাপনার রোডম্যাপ অনুসারে হজের সব কার্যক্রম সম্পাদন করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে ২০২৬ সালের হজের কার্যক্রম ২০২৫ সালের ৮ জুন হতে শুরু হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথম হজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর হজব্যবস্থাপনা যে পর্যায়ে ছিল সেখান থেকে এটিকে এগিয়ে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। এই স্বল্পসময়ে আমাদেরকে বেশ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বেসরকারি মাধ্যমের হজযাত্রীদের বাড়িভাড়া নিয়ে সমস্যা ছিল। কয়েকটি হজ এজেন্সিকে বারবার তাগিদ দেয়ার পরও বাড়িভাড়া করছিলেন না। হাব ও আরো কয়েকটি সরকারি সংস্থা আমরা একটি টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে সেটা যথাসময়ে সম্পন্ন করতে পেরেছি। এরপর আরেকটি সমস্যা দেখা দেয় বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী হজযাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিয়ে। আপনারা জানেন যে, এ বছর সৌদি সরকার মেডিক্যাল ফিটনেসের বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর। সৌদি বিমানবন্দরে অবতরণের পরও যদি কেউ মেডিক্যাল গ্রাউন্ডে আনফিট হয় সে ক্ষেত্রে তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এ কারণে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা গ্রহণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মূল বিপত্তিটা দেখা দেয় বিদেশী বাংলাদেশীদের দেশে আসা নিয়ে। যাতায়াতের খরচ ছাড়াও তাদের ছুটি পাওয়ার একটি বিষয় আছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা এটিও সন্তোষজনক সমাধান করতে পেরেছি। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও হাবের সহযোগিতায় নিবন্ধিত প্রবাসী বাংলাদেশী হজযাত্রীদের যিনি যে দেশে অবস্থান করছেন সে দেশের সরকার অনুমোদিত একটি হাসপাতাল হতে স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন করে টিকা গ্রহণপূর্বক তার সার্টিফিকেট সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকিমশনের মাধ্যমে দেশে পাঠানো ব্যবস্থা করা হয়েছে।

হজ পালনের ক্ষেত্রে মেডিক্যাল ফিটনেস সার্টিফিকেট দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সৌদি সরকারের হজব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অনলাইন প্লাটফর্ম নুসুক মাসারে এই সার্টিফিকেট আপলোড ছাড়া হজযাত্রীদের ভিসা ইস্যু করা হয় না। এ মেডিক্যাল ফিটনেস সার্টিফিকেটের জন্য প্রবাসী বাংলাদেশী হজযাত্রীদেরকে দেশে আসতে হতো এবং এখানে নির্ধারিত হাসপাতালগুলোতে গিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও টিকা গ্রহণ করতে হতো। কিন্তু আমরা এ বছর প্রবাসী বাংলাদেশী নিবন্ধিত হজযাত্রীরা যে দেশে অবস্থান সে দেশের সরকার অনুমোদিত হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছি এবং ফিটনেস সার্টিফিকেট সে দেশে অবস্থিত দূতাবাস কিংবা হাইকমিশনের মাধ্যমে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। এর ফলে যাতায়াত খরচ ও ছুটি পাওয়ার বিড়ম্বনা থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীরা রক্ষা পেয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগ প্রবাসী বাংলাদেশীদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে হজ ফ্লাইটের প্রথম ফেজে বিমান বাংলাদেশের ফ্লাইট ঘাটতি নিয়ে আরেকটি সমস্যা দেখা দেয়। প্রথম ফেজে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে হজযাত্রীদের টিকিটের যে চাহিদা ছিল সেটা মেটানোর জন্য দু’টি অতিরিক্ত ফ্লাইট প্রয়োজন দেখা দেয়। এই দু’টি ফ্লাইট ছাড়া হজ এজেন্সি থেকে শতভাগ টিকিটের পে-অর্ডার পাওয়া সম্ভব নয়। এই সমস্যাও আমরা সমাধান করতে পেরেছি। বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, বেবিচক, সৌদি বিমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা জেনারেল অথোরিটি অব সিভিল এভিয়েশন ও হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সম্মিলিত প্রয়াসে ইতোমধ্যে আমাদের শতভাগ হজযাত্রীর টিকিট ইস্যু হয়েছে।

এ বছর বাংলাদেশের হজযাত্রীদের জন্য মিনার ময়দানে দুইটি জোনে তাঁবু গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারি মাধ্যমের অধিকাংশ হজযাত্রী জোন-২ এবং বেসরকারি মাধ্যমের অধিকাংশ হজযাত্রী জোন-৫-এর তাঁবুতে অবস্থান করবেন। হজযাত্রীদের মিনা-আরাফায় সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ১০টি সার্ভিস কোম্পানির সাথে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। হজযাত্রীদের তাঁবু খুঁজে পাওয়ার সুবিধার্থে লাব্বাইক অ্যাপে মিনা ও আরাফার তাঁবুগুলোকে হজ এজেন্সির নামসহ জোনভিত্তিক বিন্যস্ত করে মক্তব ও খুঁটি নম্বরসহ গুগল ম্যাপে ট্রাকিং করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারি মাধ্যমের হজযাত্রীরা মক্কা ও মদিনার হোটেলও ট্রাকিং করতে পারবেন।

আমি গত মার্চের ২৮ তারিখে প্রথম সরকারি সফরে সৌদি আবর গিয়েছিলাম উমরাহ ও ভিজিট ফোরামের সভায় অংশগ্রহণের জন্য। এ সময় সৌদি হজ ও উমরাহ মন্ত্রীর সাথে আমার একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে হজ ও উমরাহ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে আমি সৌদি মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করি এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি লিখিত প্রস্তাবনা তার কাছে হস্তান্তর করি।

সৌদি আরবের সাথে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মরহুমা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ ও নিবিড়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা সেটাকে আবার জোরদার ও শক্তিশালী করার বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছি। ইতোমধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং আমরা তার সুফল পেতে শুরু করেছি। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, গত বছরও ভিসা নিয়ে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কিছু ভিসা পাওয়া যায়নি। কিন্তু এ বছর আমরা প্রায় শতভাগ ভিসা ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছি, মাত্র ১৬টি ভিসা ইন প্রসেস রয়েছে।

গত ১২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে হজব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় প্রধানমন্ত্রী সুষ্ঠু ও সাবলীল হজব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। তার নির্দেশনার আলোকে আমরা হজ পোর্টালে ইতোমধ্যে সব হজযাত্রীর হোটেল ও ফ্লাইটের তথ্য আপলোড করেছি। রাজধানীর আশকোনাতে আমাদের যে হজক্যাম্পটি রয়েছে, সেখানে হজযাত্রীদের অবস্থান ও খাবারের সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে। হজযাত্রীদের রিসিপশনে স্কাউটস ও আনজুমান-ই-খাদেমুল হজ সংগঠন দু’টির পাশাপাশি এ বছর অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ করা হয়েছে। হজক্যাম্পের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য পেশাদার লোকবল নিযুক্ত করা হয়েছে। মশক নিধনে সিটি করপোরেশন প্রতিদিন তাদের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবেন। এর পাশাপাশি আমরা মশক নিধন যন্ত্র স্থাপন করেছি।

এ বছর নারী হজযাত্রীদের জন্য ওজুখানাসহ পৃথক টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া হজযাত্রীদের সাথে যারা আসেন, তাদের জন্য হজক্যাম্পের উত্তর-পূর্ব পাশে নতুন টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। হজ টিমের সদস্যদেরকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

হজযাত্রীদের সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। আল্লাহর মেহমানদের সেবার প্রশ্নে সরকার সর্বোচ্চ কঠোরতার নীতি অনুসরণ করবে। আর এই সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যেসব স্টেকহোল্ডার রয়েছেন তাদেরকে যথাযথ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এবারের হজব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ পূর্ববর্তী সরকারের সময় করা হয়েছে। এর মধ্যে যেসব বিষয়ে ত্রুটি বা দুর্বলতা দেখা গেছে সেগুলো সংশোধনের পদক্ষেপ নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে গেছি। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে এ বছরের হজব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুষ্ঠু, সাবলীল ও মসৃণ হবে। আগামী হজ মৌসুমে এই ব্যবস্থাপনার আরো উন্নয়ন সাধনের বিষয়ে আমরা সচেষ্ট হবো- ইনশাআল্লাহ।

হজযাত্রীদের প্রতিশ্রুত সেবা নিশ্চিত করাটাই কার্যকর ও জনবান্ধব হজব্যবস্থাপনার নির্ণায়ক। হজব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সদিচ্ছা ও ফলপ্রসূ উদ্যোগ ব্যতীত এরূপ হজব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। অধিকন্তু, হজ প্রশাসনকে হতে হবে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক। একটি সাশ্রয়ী, মানবিক ও প্রবাসীবান্ধব হজব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণে সরকার বদ্ধপরিকর।