যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের হামলা
প্রায় ৪০ হাজার ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত
Printed Edition
আলজাজিরা
ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত গোলাবর্ষণ এবং ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়ার খবরের মধ্যেই লেবাননের হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত পরিবার তাদের নিজ ভূমিতে ফিরতে শুরু করেছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকায় এখনো পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
শনিবার দেখা গেছে, তোশক, ব্যাগ এবং যৎসামান্য আসবাবপত্র বোঝাই গাড়ির দীর্ঘ সারি দক্ষিণ অভিমুখে ছুটছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ির শেষ চিহ্নটুকু দেখতে মরিয়া এই পরিবারগুলো। নাবাতিয়ে থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া ফাদেল বদরেদ্দিন বলেন, চার পাশে শুধু ধ্বংসলীলা, এখানে এখন আর বাস করার মতো অবস্থা নেই। আমরা আমাদের দরকারি জিনিসপত্র নিয়ে আবারো চলে যাচ্ছি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আল্লাহ যেন এই অবস্থার অবসান ঘটান এবং আমাদের স্থায়ীভাবে ফেরার ব্যবস্থা করেন’।
লেবানন সরকারের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই যুদ্ধে প্রায় ৪০ হাজার ঘরবাড়ি পুরোপুরি ধ্বংস বা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলী এবং দক্ষিণ লেবাননের জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈরুতের বাসিন্দা সামিয়া লাওয়ান বলেন, আমি শুধু ঘরের কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস নিতে এসেছি। গত যুদ্ধেও আমার বাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এবারো সেই একই দৃশ্য।
দীর্ঘ ৪৬ দিনের ভয়াবহ হামলার পর ১০ দিনের বিরতি স্বস্তি নিয়ে আসার কথা থাকলেও ইসরাইলি উসকানিতে জনমনে শঙ্কা কাটছে না। আলজাজিরার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননের বেইত লিফ, আল-কান্তারা এবং তৌল এলাকায় ইসরাইলি বুলডোজারগুলো ভূমি পরিষ্কার ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে কামানের গোলা বর্ষণের খবরও পাওয়া গেছে। লিতানি নদীর দক্ষিণাঞ্চলের সংযোগকারী সেতুগুলো ভেঙে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম বিঘœ ঘটছে।
ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা বর্তমানে লেবাননের ৫৫টি শহর ও গ্রাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। সীমান্তের অভ্যন্তরে ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত তারা একটি ‘ইয়েলো লাইন’ বা নিরাপত্তা অঞ্চল তৈরি করেছে, যেখান থেকে ভারী কামান পরিচালনা করা সম্ভব। ইসরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, লিতানি নদী পর্যন্ত এলাকা থেকে যোদ্ধাদের না সরানো পর্যন্ত তারা সামরিক বা কূটনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন।
এই উত্তেজনার মধ্যেই আগামী কয়েক দিনে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শনিবার বাবাদা প্রাসাদে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম এক বৈঠকে মিলিত হন। তারা যুদ্ধবিরতি সুসংহত করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এবং অন্যান্য বিশ্বনেতাকে সাথে যোগাযোগের বিষয়ে আলোচনা করেন।
তবে ইসরাইলের সাথে এই আলোচনায় বসা লেবানন সরকারের জন্য অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। হিজবুল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল নিয়ে ঐকমত্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত তারা অস্ত্র ছাড়বে না। এই যুদ্ধবিরতি কেবল লেবাননে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সাথে ইসলামাবাদে আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ভাগ্যও জড়িয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।