আন্দোলনের চাপে অস্থির শিক্ষাঙ্গন

সহজ ও টেকসই সমাধান খুঁজছে সরকার

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition
Shahbag
কুয়েট ভিসির পদত্যাগ দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ (২৩ এপ্রিল) | নয়া দিগন্ত

কারণে অকারণে আন্দোলনে চাঙ্গা শিক্ষাঙ্গন। বিশেষ করে ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টের বিপ্লবের পর থেকে রাজধানী ঢাকাসহ বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও নানা কারণে আন্দোন দানা বেঁধেছে। সম্প্রতি পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের ছয় দফা দাবিতে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শিক্ষা প্রশাসনকেও বেশ চাপে ফেলেছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভিসির পদত্যাগের দাবিতে ঢাকায় এসে শাহবাগে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। কুয়েটের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে গতকাল থেকে আন্দোলনে নেমেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। একই সময়ে সরকারি কর্মকমিশনের পরীক্ষা ও ফলাফল কেন্দ্রিক দাবি-দাওয়া নিয়েও আন্দোলনে নেমেছেন চাকরি প্রার্থীরা। সব মিলিয়ে শিক্ষাঙ্গন কেন্দ্রিক আন্দোলন নিয়ে বেশ সরগরম শিক্ষা প্রশাসন। যদিও সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে বিগত ১৬ বছরের বঞ্চনা আর নানা অনিময়ের কারণেই মূলত শিক্ষাঙ্গনে এখন অস্থির অবস্থা বিরাজ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে সব কিছু আমলে নিয়েই সমাধানেরও চেষ্টা করা হচ্ছে।

এ দিকে গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ঢাকাসহ সারা দেশেই চলছে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচি। তারা চাকরি, পদোন্নতি ও উচ্চশিক্ষার নিশ্চয়তাসহ ছয় দাবির মধ্যে যৌক্তিক দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছেন। ইতোমধ্যে তারা জেলা, বিভাগীয় এবং ঢাকায় মহাসমাবেশেরও কর্মসূচি পালন করেছেন। সম্প্রতি কারিগরি ছাত্র আন্দোলন, বাংলাদেশ এর পক্ষ থেকে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন ছয় দাবি বাস্তবায়নের রূপরেখা প্রণয়নে আট সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। তারা আমাদের কাছে তিন সপ্তাহ সময় চেয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় ও কমিটির ওপর আস্থা রেখে আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের অগ্রগতি না হলে আমরা আবারো আন্দোলনে নামবো।

অপর দিকে গতকাল দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কারিগরি ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা গত সোমবার কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় ছয় দাবির মধ্যে যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণের লক্ষ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা এবং একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া বলা হয়, কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের সঙ্গে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনরত ছাত্ররা তাদের আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করে ক্লাসে ফিরে যাবেন এবং শিক্ষাঙ্গনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখবেন মর্মে ঘোষণা করেছে।

উল্লেখ্য গত ১৬ এপ্রিল ছয় দাবিতে সারা দেশের সড়ক, মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। ১৭ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ‘রেল ব্লকেড’ কর্মসূচি ঘোষণা করলেও শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তাব পেয়ে কর্মসূচি শিথিল করেন তারা। কিন্তু উপদেষ্টা না থাকায় অতিরিক্ত সচিবের (কারিগরি অনুবিভাগ) সঙ্গে বৈঠক করলেও, তা ব্যর্থ হওয়ায় সন্ধ্যার পর মশাল মিছিল এবং ১৮ এপ্রিল জুমার পর মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। এর পর ১৯ এপ্রিল লাল কাপড় দিয়ে সারা দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর প্রধান ফটক ঢেকে দিয়ে ‘রাইজ ইন রেড’ কর্মসূচি পালন ও ২০ এপ্রিল মহাসমাবেশের কর্মসূচি পালন করেন তারা।

সূত্র জানায়, একই সময়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভিসির পদত্যাগের এক দফা দাবিতে কুয়েটে চলমান অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি)। গতকাল বুধবার জবির ভাষাশহীদ রফিক ভবনের নিচে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। জবি সূত্র জানায় ‘কুয়েটে চলমান ভিসির পদত্যাগের দাবিতে অনশনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমরা সংহতি জানাচ্ছি। ৪২ ঘণ্টা ধরে অনশনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। কিন্তু এই ইনটেরিম সরকার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন থেকে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। শিক্ষার্থীরা জানান, ‘বহিরাগত দ্বারা কুয়েট শিক্ষার্থীরা হামলার শিকার হয়ে বিচার চেয়ে আন্দোলন শুরু করে। তবে উল্টো হামলার ঘটনা তদন্ত করা বা দোষীদের বদলে শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। এর পর শিক্ষার্থীদের নামে মামলাও করা হয়।

অবশ্য সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা নিয়ে সরকার নিজেও উদ্বিগ্ন উল্লেখ করে শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার গতকাল বুধবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা যেন আর না ঘটে সে বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো সমাজ একটি অস্থিরতার মধ্যে চলছে এবং সব যে রাতারাতি ঠিক হয়ে যাবে, সেটা ভাবাও বোধ হয় ঠিক নয়। তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের নানা অনিয়ম আর বঞ্চনার কারণেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বিপ্লবী মনোভাব চলে এসেছে। জুলাই-আগস্টের যে ঐতিহাসিক অর্জন এটা এই শিক্ষার্থীরাই নেতৃত্ব দিয়েছেন। কাজেই তাদের মান-অভিমান আর অভিযোগ-অনুযোগ সব কিছুই আমরা বিবেচনায় নেবো। তবে একটু সময় দিতে হবে। আমরা চেষ্টা করছি সব কিছুরই একটি সহজ এবং সমাধান যোগ্য মীমাংসা করার।