‘সে ছুরিতে খুন হননি’ : যেভাবে ফরেনসিক প্রমাণ ড. তাহেরের ক্ষেত্রে বাতিল করা হয়
Printed Edition
ড. তাহের হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অবহেলার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে। আপিল বিভাগের বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা প্রমাণকে সম্মান করতে অস্বীকৃতি জানানোয় সম্ভবত দুই নিরপরাধ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মামলাটি ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অনুসিদ্ধান্ত আদালতের বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে
৫ এপ্রিল ২০২২-এ, আপিল বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সিনিয়র অধ্যাপক ড. তাহের আহমেদ হত্যায় দু’জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। আপিল বিভাগের এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মিয়া মো: মহিউদ্দিন ও ড. তাহের আহমেদের বাসার কেয়ারটেকার মো: জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে ফরেনসিক প্রমাণের স্পষ্ট অসঙ্গতি রায় সম্পর্কে উদ্বেগজনক প্রশ্ন উত্থাপন করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুপ্রতিষ্ঠিত নিয়ম মেনে চললে এ ক্ষেত্রে কোনো মৃত্যুদণ্ড দেয়া সম্ভব হতো না। পুলিশ যে খুনের অস্ত্র (একটি ছুরি) উদ্ধার করেছে, বৈজ্ঞানিকভাবে দেখানো হয়েছে ড. তাহেরের আঘাতের সাথে সেটি মেলানো যায়নি। আর প্রসিকিউশন যে সময়ে তাহেরের মৃত্যুর কথা বলেছে বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণের সাথে তার মিল ছিল না। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এ দু’টি দিক ইঙ্গিত দেয় যে, বিবেচ্য ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের গুরুতর বিচ্যুতি ঘটেছে।
পুলিশ জানিয়েছিল, ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ড. তাহের আহমেদ সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৬টায় ঢাকা থেকে রাজশাহীতে ফিরে আসেন। আনুমানিক পৌনে ৮টায় তার স্ত্রীকে ফোন করে জানান, তিনি নিরাপদে পৌঁছেছেন। পরে রাত ১০টায় ড. তাহেরকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে হামলা করে হত্যা করা হয়।
যখন ড. তাহের পরের দিন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগীয় বৈঠকে যোগ দিতে ব্যর্থ হন এবং তার কাছে পৌঁছানো যাচ্ছিল না, তখন তার সহকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। স্ত্রী তার সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে অনুষদের অন্য সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করেন। ২ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে রেজিস্ট্রার ও পুলিশসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা তার বাসভবনে তল্লাশি চালায়। কিন্তু তার কোনো হদিস পায়নি। ২০০৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে, যখন ড. তাহেরের লাশ তার বাড়ির পেছনে একটি ম্যানহোলে পাওয়া যায় তখন ভয়াবহ ‘আবিষ্কারটি’ ঘটে। পুলিশ অভিযোগ করে, ড. মিয়া মো: মহিউদ্দিন এ হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন, কারণ ড. তাহেরকে অধ্যাপক হিসেবে নিজের পদোন্নতির পথে বাধা হিসেবে দেখেছিলেন। কেয়ারটেকার মো: জাহাঙ্গীর আলমের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে পুলিশ কেসটি করা হয়েছিল ৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ তারিখে। কেয়ারটেকার স্বীকার করেন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ তারিখে ছুরি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তিনি ড. তাহেরকে হত্যা করেছিলেন। কেয়ারটেকার তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের চেষ্টা করেছিলেন, কারণ তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬-এর সন্ধ্যা থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ পর্যন্ত তিন দিনের বেশি পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের মাধ্যমে এটি আদায় করা হয়।
লাশের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে অনেকগুলো আঘাত দেখানো হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে ডক্টর তাহেরের মাথার পেছনে একটি কাটাসদৃশ আঘাত রয়েছে। ‘কাটাসদৃশ আঘাত’ শব্দটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি সুসংজ্ঞায়িত শব্দ। একটি ‘ছেদিত চেহারার আঘাত’ (কাটাসদৃশ আঘাত) শুধু একটি ভোঁতা এবং একটি লোহার রড বা একটি ভারী কুঠারের মতো ভারী অস্ত্র দিয়ে করা হতে পারে। অন্য দিকে একটি ‘ছেদিত আঘাত’ (কাটা আঘাত) শুধু একটি ছুরি বা রেজারের মতো ধারাল কাটার যন্ত্রে হতে পারে। এভাবে যদিও ‘ছেদিত চেহারার ইনজুরি’ এবং ‘ছেদিত আঘাত’ শব্দগুলো একই রকম শোনায়, চিকিৎসা-আইনশাস্ত্রে এ দু’টি বিভিন্ন যন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের আঘাতের প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং ড. তাহেরের মাথার পেছনের আঘাতটি শুধু লোহার রডের মতো ভোঁতা এবং ভারী অস্ত্রে হতে পারে, ছুরি ধরনের ধারাল কিছু দিয়ে নয়।
তবে ৫ ফেব্রুয়ারি পুলিশ দাবি করে, তারা কথিত অস্ত্র ‘পলিথিনে মোড়ানো একটি ছুরি’ উদ্ধার করে। কিন্তু ছুরি একটি ধারাল যন্ত্র যা ড. তাহেরের মাথার পেছনে আঘাতের কারণ হতে পারে না। তবে পুলিশ ছুরিটি প্রদর্শনী নং (১৫) প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করেছে। এটিকে হত্যার অস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ (প্রসিকিউশন উইটনেস নং ৪৪) রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের একজন প্রভাষককে যখন পুলিশের উদ্ধার করা ছুরিটি ড. তাহেরের শরীরে উপস্থিত আঘাতের কারণ হতে পারে কি না জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন তিনি বলেন, ‘আঘাতগুলো ভোঁতা অস্ত্রের দ্বারা হয়েছে। সেগুলো কোনো ধারাল অস্ত্রের দ্বারা নয়। মৃত ব্যক্তির (ঘাড় বা ঘাড়ের পেছনে) কোনো আঘাত নেই। এই বস্তু (প্রদর্শনী [১৫] ছুরি) দিয়ে হতে পারে এমন কোনো ধারাল আঘাত মৃত ব্যক্তির শরীরে নেই।’
সুতরাং ড. তাহেরকে হত্যায় যে ছুরিটি উদ্ধার করেছে পুলিশ, তা ব্যবহার করা হয়নি বলে চিকিৎসাবিশেষজ্ঞের স্পষ্ট প্রমাণ ছিল।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় উপমহাদেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের চিকিৎসা গ্রন্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উপমহাদেশে চিকিৎসা আইনশাস্ত্রের সবচেয়ে বিখ্যাত পাঠ্যপুস্তক হলো ‘এ টেক্সবুক অব মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স অ্যান্ড টক্সিকোলোজি’, যা ব্রিটিশ ভারতে ১৯২০ সালে ডা: জয়সিং পি মোদি দ্বারা প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি ভারতীয় ভিকটিমদের ওপর আঘাত অধ্যয়নের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এবং বইটির ২৫ সংস্করণ এর মধ্যে প্রকাশ হয়েছে। আজও এটি ফরেনসিক বিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যপুস্তক হিসেবে স্বীকৃত। একই সাথে আদালতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। মোদির বই অনুসারে মাথায় একটি ‘ছেদিত চেহারার আঘাত’ বা কাটাসদৃশ আঘাত শুধু একটি ভোঁতা অস্ত্র বা ভারী কুড়ালের কাটা অস্ত্রে হতে পারে।
মোদি আরো বলেছেন, আঘাতের প্রান্তে একটি ছেঁড়া-দেখানো অনিয়মিত ক্ষত এবং ‘আঘাতজনিত ফোলা’ থাকে অন্য দিকে একটি ‘ছেদিত কাটা’ ক্ষত পরিষ্কার, মসৃণ ও সুশৃঙ্খল কারণ এটি ছুরি, কাঁচি, ক্ষুর বা তলোয়ারের মতো ধারাল কাটা অস্ত্র দিয়ে সৃষ্ট হয়। যদিও দু’টি আঘাত খালি চোখে দেখতে একই রকম হতে পারে, মাইক্রোস্কোপের নিচে বাস্তবে এ দু’টি বেশ আলাদা। এভাবে মোদি কিভাবে একটি ‘কাটাসদৃশ আঘাত’ এবং একটি কাটা আঘাত আলাদা দেখায় এবং কিভাবে সেগুলো বিভিন্ন অস্ত্রের কারণে ঘটে তার মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য করে দেখান। মোদির এ মতামতগুলো উপমহাদেশের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় পাঠ্যপুস্তকেও পাওয়া যায়, যা বকশীর ‘নোটস অন মেডিক্যাল জুরিসপ্রুডেন্স অ্যান্ড টক্সিকোলজি’ বইয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। এভাবে উপমহাদেশে ব্যবহৃত নেতৃস্থানীয় চিকিৎসা টেক্সটগুলো কেবল ছেদিত-দেখানো ক্ষত ও ছেদ করা ক্ষতের মধ্যে পার্থক্য করেনি; বরং এটিও বলে যে সেগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন অস্ত্র দ্বারা সৃষ্ট। সুতরাং নিষ্পত্তিকৃত চিকিৎসা আইনশাস্ত্র অনুসারে ছুরিটি ড. তাহেরকে হত্যায় ব্যবহার করা যেতে পারে না। এটি ইঙ্গিত দেয়, পুলিশ প্রকৃত হত্যার অস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি এবং মিথ্যা প্রমাণ হিসেবে ছুরিটি কাজে লাগিয়েছিল।
এ ধরনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ সাজা বহাল রাখতে অসুবিধার সম্মুখীন হন। তাই আপিল বিভাগ চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক ফল উপেক্ষা করেছেন এ বলে যে, ‘ছেদিত-দেখার আঘাত’ এবং ‘ছেদিত আঘাতের’ মধ্যে পার্থক্য ‘খুব সামান্য’। আপিল বিভাগ বলেছেন, দুই ধরনের আঘাতের মধ্যে কোনো লক্ষণীয় পার্থক্য নেই। ‘ডাক্তারের কথাই শেষ কথা নয়’ বলে এখানে ডাক্তারের মতামতও উপেক্ষা করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, যদিও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা কাটা এবং কাটা দেখানো আঘাতের মধ্যে পার্থক্য প্রদর্শনে চিকিৎসা গ্রন্থের ওপর নির্ভর করেছিলেন, তবে সরকারি আইনজীবী বা আপিল বিভাগ কেউ চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের প্রমাণ উপেক্ষা করতে চিকিৎসাসংক্রান্ত বইয়ের নিবন্ধ বা চিকিৎসা মতামতের ওপর নির্ভর করেননি।
ড. তাহের হত্যা মামলার অন্য প্রধান বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি হলো মৃত্যুর কথিত সময়। আপিল বিভাগের মতে, ড. তাহেরকে ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে কেয়ারটেকার মো: জাহাঙ্গীর আলম খুন করে। তবে প্রসিকিউশন সাক্ষী নং ৪৪ (চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ)-এর প্রমাণ অনুসারে, ময়নাতদন্তের ১৭ ঘণ্টা আগে (অর্থাৎ ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ রাত পৌনে ৯টা) ভিকটিম মারা গিয়েছিলেন। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ তার জবানবন্দীতে বলেছেন, ‘এই মৃত্যুটি পচন না থাকায় ২১ হতে চার বাদ দিলে পরীক্ষা করার সময় হইতে ১৭ ঘণ্টার মধ্যে সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ বেলা পৌনে ২টায় পরীক্ষা করেছিলাম।’
এ হিসাবে প্রসিকিউশন মামলা ও ঘটনার সময় সম্পর্কিত পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মধ্যে একটি গুরুতর অমিল রয়েছে। কেয়ারটেকার ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। তিনি যদি ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ পর্যন্ত পুলিশ হেফাজতে থাকেন, তবে ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ একই রাতে তিনি কিভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারতেন? এ অসঙ্গতি আপিল বিভাগের আগেই উত্থাপিত হয়েছিল, আপিল বিভাগ এ অসঙ্গতিকে আমলে নেননি।
এ লেখায় আমরা দেখানোর চেষ্টা করেছি কিভাবে আপিল বিভাগ দু’জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছেন। তবে এর মধ্যে আরো অনেক অমিল ছিল। উদাহরণস্বরূপ, যদি হত্যাকাণ্ডটি ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ সংঘটিত হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের রক্তমাখা কার্পেট ও বালিশ যারা ২৪ ঘণ্টা পরে ২ ফেব্রুয়ারি রাতে ড. তাহেরের কক্ষ পরিদর্শন করেছিলেন তাদের পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এ কর্মকর্তারা তখন সন্দেহজনক কিছু পাননি। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই কর্মকর্তার সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে স্পষ্ট, যারা প্রসিকিউশন সাক্ষী নং ২৫ ও ২৯ হিসেবে সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রসিকিউশন সাক্ষী নং ২৯ ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ রাতে তার পরিদর্শন সম্পর্কে বলেছেন যে, ‘আমরা তাহের স্যারের বাসায় বিভিন্ন রুম জাহাঙ্গীরসহ খোঁজ করি। তখন আমাদের চোখে সন্দেহজনক কিছু পড়ে নাই।’
তবে পুলিশের মতে, রক্তমাখা কার্পেট ও বালিশটি ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ উদ্ধার করা হয়। ড. তাহের যদি ১ ফেব্রুয়ারি ২০০৬-এ খুন হয়ে থাকেন, তাহলে রক্তমাখা কার্পেট ও বালিশ ২ ফেব্রুয়ারি ২০০৬-এ তাঁর কক্ষে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের মতে সেটি দেখা যায়নি। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, রক্তমাখা কার্পেট ও বালিশগুলো পুলিশ কর্তৃক ৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ মিথ্যা প্রমাণ হিসেবে রাখা বা কাজে লাগানো হয়েছিল।
প্রসিকিউশন পুরো মামলাটি কেয়ারটেকার মো: জাহাঙ্গীর আলমের স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করে, যিনি তিন দিন পুলিশ হেফাজতে থাকার পরে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এটি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে তার স্বীকারোক্তি দীর্ঘ নির্যাতনের মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল। এ ছাড়াও ডাক্তারি প্রমাণ দেখায়, ড. তাহেরকে হত্যা করা হয় কেয়ারটেকার পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন। অধিকন্তু কেয়ারটেকার যে ছুরিটি হত্যায় ব্যবহার করেছেন (তার স্বীকারোক্তি অনুসারে) তার সাথে ড. তাহেরের শরীরের আঘাত মেলে না। অবশেষে, রক্তমাখা কার্পেট ও বালিশগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা খুঁজে পাননি যারা হত্যার অভিযোগের এক দিন পরে ড. তাহেরের বাড়ি পরিদর্শন করেছিলেন। ৩ ফেব্রুয়ারি হত্যার অভিযোগের দুই দিন পর কেয়ারটেকার পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে আকস্মিকভাবে এরা তার বাসায় হাজির হয়ে পেয়ে যায়। সাক্ষ্য-প্রমাণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কেয়ারটেকার পুলিশ হেফাজতে থাকা অবস্থায় ড. তাহেরকে হত্যা করা হয়েছিল এবং মিথ্যা প্রমাণ তৈরি করতে ছুরি, কার্পেট ও বালিশ- এসব প্রমাণ পরে পুলিশ কাজে লাগিয়ে ছিল।
ড. তাহের হত্যা মামলায় আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অবহেলার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে। আপিল বিভাগের বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা প্রমাণকে সম্মান করতে অস্বীকৃতি জানানোয় সম্ভবত দুই নিরপরাধ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মামলাটি ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অনুসিদ্ধান্ত আদালতের বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এবং হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিবন্ধিত কৌঁসুলি