শেষ কর্মদিবসেও তৎপর ডিসি সারওয়ার
Printed Edition
- শাহজালাল মাজারে দানবাক্সে মিলল ১৭ লক্ষাধিক টাকা ও স্বর্ণ
- পুনর্বহালের দাবিতে দিনভর কর্মসূচি পালন
শেষ কর্মদিবসেও নিজ কাজে অটল থেকে কর্মতৎপরতা দেখিয়ে গেছেন সদ্য বিদায়ী সিলেটের জনবান্ধব জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম। প্রত্যাহারের ঘোষণার পরদিনই শত বছরের কথিত প্রথা ভেঙে দানের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করে নজির স্থাপন করেন তিনি। ৪ দিনে দান বাক্সে মিলে ১৭ লক্ষাধিক টাকা, স্বর্ণ ও বিদেশী মুদ্রা।
গতকাল সোমবার বিকেলে শাহজালাল (রহ.) মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন ডিসি সারওয়ার আলম। সেখানে মাজারের দানের দু’টি ডেগ এবং জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থাপন করা দানবাক্স থেকে টাকা বের করে গণনার কার্যক্রম শুরু করা হয়। গণনার সময় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তবে এ বিষয়ে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কোনো বক্তব্য দেননি সারওয়ার আলম। তিনি পরে এ বিষয়ে একটি ভিডিও বার্তা দেবেন বলে জানিয়েছেন।
গণনার সময় মাজারের দু’টি ডেগ এবং জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থাপন করা দানবাক্স থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণ বের করে হিসাব করা হয়। গণনা শেষে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা এবং ৭ আনা স্বর্ণ পাওয়া যায়। ৪ দিনে ডেগে ও দানবাক্সে এসব টাকা জমা হয়।
সূত্রে জানা গেছে, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিউকের উদ্যোগে মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এই কমপ্লেক্স নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে সিউক ২০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা আসে এবং বাকি পাঁচ কোটি টাকা দেয়ার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষকে বলা হয়। কিন্তু মাজার কর্তৃপক্ষ কোনো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। একপর্যায়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সিসিক থেকে তিন কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেন। বাকি দুই কোটি টাকার জন্য মাজার কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হলেও সেই দাবিও প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ও স্থানীয় শীর্ষ বিএনপি নেতাদের সমন্বয়ে মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা আনতে দানের টাকা হিসেবের উদ্যোগ নেয়া হয়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের দানের ডেগ বাক্স সীলগালা এবং সরকারি দানবাক্স বসানো হয়। দান বাক্স ও ডেগের উপর বসানো হয় সিসি ক্যামেরা।
মাজারের দান ও আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সিলেটজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এদিকে রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপ-সচিব হিসেবে ন্যস্ত করা হয়। প্রজ্ঞাপনে তার প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে সিলেটে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
ডিসির প্রত্যাহারের খবরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। রোববার বিকেলে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ডিসি সারওয়ার আলমকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে নগরীতে পৃথক বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
সোমবারও সকাল থেকে দিনভর জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন ব্যানারে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায় চলা এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণেই তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, সিলেটের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে সারওয়ার আলম সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তাকে সরানোর পেছনে একটি প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। সোমবার সকালে কার্যালয়ে প্রবেশের সময় বিক্ষোভকারীদের সাথে করমর্দন করেন সারওয়ার আলম। পরে তাদের স্লোগানের মধ্যেই তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। দুপুরে নিজ কার্যালয় থেকে বের হয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করেন তিনি। বিকেলে মাজারের দানের ডেগ ও দানবাক্স খুলে গণনার উদ্যোগ নেন ডিসি।
জেলা প্রশাসনের এমন কর্মকাণ্ডে ধর্মপ্রাণ ও সচেতন নাগরিকরা খুশি হলেও মাজারের খাদেমচক্র নাখোশ হন। তারা ডিসির এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। যদিও জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম বিদায়ের শেষ মুহূর্তেও তাদের কাছে নতি স্বীকার করেননি। বরং প্রকাশ্যে দান বাক্সের টাকা গণনার নজির স্থাপন করেছেন। পরবর্তী ডিসিকে এর ধারাবাহিকতা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন সিলেটবাসী।