গাজামুখী ত্রাণবাহী জাহাজে ইসরাইলের হামলা

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • যুদ্ধের বিরুদ্ধে রিজার্ভ সেনাদের প্রতিবাদে চাপে নেতানিয়াহু
  • নতুন করে ৪,২৩,০০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত

গাজার জন্য ত্রাণসহায়তা ও স্বেচ্ছাসেবক বহনকারী একটি জাহাজে গতকাল শুক্রবার ভোরবেলা ড্রোন হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী। মাল্টার কাছে আন্তর্জাতিক পানিসীমায় হামলার শিকার জাহাজের কর্মীদের উদ্ধার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে মাল্টা সরকার। অন্য দিকে অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে বর্বর ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় শুক্রবার আরো ২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা।

খবরে বলা হয়, শুক্রবার মধ্য গাজার বুরেইজ এলাকায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় একই পরিবারের ৯ সদস্য নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে অব্যাহত ইসরাইলি হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫২ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া এক লাখ ১৮ হাজার ১৪ জন ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুসারে জাহাজটি পাঠিয়েছিল দ্য ফ্রিডম ফ্লোটিল্লা কোয়ালিশন নামের একটি আন্তর্জাতিক এনজিও। হামলার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করে সংস্থাটি বলেছে, ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে তলব করতে হবে। গাজায় ত্রাণ প্রবেশে অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক পানিসীমায় বেসামরিক বাহনে হামলার মতো অপরাধের জন্য তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। হামলার বিষয়ে ইসরাইলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মাল্টা সরকার জানায়, মধ্যরাতের কিছু পর সমুদ্র কর্তৃপক্ষের কাছে একটি জরুরি সঙ্কেত আসে। তাদেরকে একটি জাহাজে আগুন লাগার খবর জানানো হয়। জাহাজটি মাল্টার আঞ্চলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করছিল এবং এতে ১২ জন ক্রু ও চারজন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। এর আগে সামাজিক মাধ্যমে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন দাবি করেছিল, জাহাজে অবস্থানরত ৩০ জন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এ সংস্থাটি গাজায় ইসরাইলি অবরোধের সমাপ্তি ঘটানোর জন্য একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারা সম্ভাব্য কোনো নাশকতা এড়াতে কোনো খবর না ছড়িয়ে তা চুপচাপ ত্রাণ নিয়ে আসতে চেয়েছিল বলে দাবি করা হয়। সংস্থাটি দাবি করেছে, গাজায় এই মিশন সফল করার জন্য ২১টি দেশ থেকে স্বেচ্ছাসেবীরা অংশ নিয়েছিল। তবে নির্ধারিত দিনে যাত্রা শুরুর সকালেই জাহাজটি হামলার শিকার হয়। বেসামরিক জাহাজটি দু’বার ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।

২০১০ সালে গাজা উদ্দেশে যাওয়া ফ্রিডম ফ্লোটিল্লা জোটের আরেকটি জাহাজকেও একই ধরনের মিশনের সময় থামিয়ে দেয়া হয়। সেবার জাহাজে উঠে পড়ে ইসরাইলি সেনারা। ওই ঘটনায় ৯ জন কর্মী নিহত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে অন্য কয়েকটি জাহাজও একইভাবে বাধা ও জব্দ করা হয়েছে, তবে সেসব ক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

রিজার্ভ সেনাদের প্রতিবাদ :

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবর অনুসারে, গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ অব্যাহত থাকলেও দেশটির অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। গত কয়েক সপ্তাহে হাজার হাজার রিজার্ভ সেনারা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকারের যুদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে চিঠি স্বাক্ষর করেছেন। তারা যুদ্ধ বন্ধ করে হামাসের কাছে আটক থাকা বাকি ৫৯ জন বন্দিমুক্তির জন্য চুক্তির দিকে মনোযোগ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

গত ১৮ মাস ধরে হামাসকে পরাজিত করে বন্দীদের মুক্ত করাই ছিল ইসরাইলের মূল লক্ষ্য। জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতি ও ৩০ জনের বেশি বন্দী ফিরে আসায় অনেকের মনে আশা জেগেছিল যে যুদ্ধ শিগগিরই শেষ হতে পারে। কিন্তু মার্চের মাঝামাঝি ইসরাইল যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবারো যুদ্ধ শুরু করলে সেই আশা ভেঙে যায়। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান ড্যানি ইয়াতোম বলেন, আমরা বুঝতে পেরেছি যে নেতানিয়াহুকে শুধু নিজের স্বার্থই ভাবায়। তার অগ্রাধিকার তালিকায় সরকারকে স্থিতিশীল রাখাই প্রধান, বন্দীদের মুক্তি নয়। এপ্রিলের শুরুতে প্রথম যে খোলা চিঠি প্রকাশিত হয়, তাতে এক হাজার বিমানবাহিনীর রিজার্ভ ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্য স্বাক্ষর করেন। তারা লিখেছেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এর কোনো ঘোষিত লক্ষ্যই অর্জন করতে পারবে না, বরং বন্দীদের মৃত্যু ডেকে আনবে।

এর পর থেকে সামরিক বাহিনীর প্রায় সব শাখা থেকেই এমন চিঠি প্রকাশিত হয়েছে, যাতে ১২ হাজারের বেশি স্বাক্ষর জমা পড়েছে। গত ৭ অক্টোবরের পর হাজার হাজার রিজার্ভ সেনা ডাকে সাড়া দিলেও এখন অনেকেই ডিউটিতে যেতে অস্বীকার করছেন। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিজার্ভ উপস্থিতি ৫০-৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। জেরুসালেমের এক উদ্যানে কথা হয় ইওয়াব (ছদ্মনাম) নামের এক পদাতিক রিজার্ভ সেনার সাথে। গত গ্রীষ্মে গাজায় ডিউটি করা ইওয়াব বলেন, তিনি আর কখনো যুদ্ধে যাবেন না। আমার মনে হয়েছিল আমি আমার ভাইবোনদের সাহায্য করতে যাচ্ছি। কিন্তু এখন আমি আর সেটি মনে করি না। সমালোচকরা বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী বলে দাবি করা ইসরাইলের তত কঠিন হয়ে পড়ছে। বাম ঘরানা ইসরাইলি দৈনিক পত্রিকা হারেৎজ-এ অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আমিরাম লেভিন লিখেছেন, সেনাদের এখন আদেশ অমান্য করার কথা ভাবা উচিত। নেতানিয়াহু প্রতিবাদকারীদের ‘প্রচারণা মিথ্যা’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এরা ‘অল্প কিছু প্রান্তিক ব্যক্তি’। কিন্তু জরিপ বলছে, জিম্মিদের মুক্তিকে অগ্রাধিকার দেয়ার পক্ষে জনমত বাড়ছে।

তেল আবিবে এক বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। সেখানে বন্দীদের ছবি নিয়ে প্রতিবাদ করা হয়, আবার কেউ কেউ গাজায় নিহত ফিলিস্তিনি শিশুদের ছবি হাতে রাস্তায় বসে থাকেন। গত ২০ এপ্রিল পুলিশ গাজার শিশুদের ছবি নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিলে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করে নেয়। এ দিকে নেতানিয়াহু হামাসকে পরাজিত করার দৃঢ় সঙ্কল্পের কথা জানিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, সামরিক চাপই বন্দীদের বাড়ি ফেরার একমাত্র উপায়।

৬০ দিনের অবরোধ : গাজায় আলজাজিরার সংবাদদাতা ইসরাইলের ৬০ দিনের অবরোধকে বেসামরিক জনগণকে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বাসরোধ’ করা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পৃথক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা আনাদোলু বলছে, গাজা উপত্যকায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের গণহত্যামূলক আগ্রাসনে ভূখণ্ডটিতে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫২ হাজার ৪১৮ জনে পৌঁছেছে বলে বৃহস্পতিবার গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

নতুন করে বাস্তুচ্যুত : তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলুর খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইল সামরিক হামলার মাত্রা তীব্র করার ফলে গাজার মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসঙ্ঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরাইল নতুন করে হামলা শুরুর পর থেকে চার লাখ ২৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গাজায় সংস্থাটির মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) সতর্ক করেছে, ইসরাইলি হামলা তীব্র হওয়ায় এবং উপত্যকায় অভ্যন্তরীণ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় মানবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তেল আবিবের হামলা ত্রাণকর্মী ও তাদের স্থাপনার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ইসরাইল বর্তমানে মানুষের বসতবাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, বিশেষ করে যেসব স্থানে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা আশ্রয় নিয়েছে, সেগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে গাজায় মানবিক সঙ্কট তীব্র হয়েছে, বিশেষ করে রাফা এবং গাজার পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোতে এর তীব্রতা বেড়েছে। ডুজারিক বলেছেন, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত গাজায় নতুন করে চার লাখ ২৩ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। গাজায় এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেরও অভাব দেখা দিয়েছে। ত্রাণকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, জানান ডুজারিক।

তিনি আরো বলেন, এ দিকে আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এখনো জীবনরক্ষাকারী জরুরি জ্বালানির মজুদ উদ্ধার করতে পারছেন না, কারণ এসব এলাকায় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্য এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত আমরা ৯ বার চেষ্টা করেছি, যার মধ্যে আটবারই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাধা পেয়েছি।

গাজার শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতার ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসঙ্ঘের মুখপাত্র। তিনি বলেন, শিশুদের নিয়ে কাজ করা আমাদের সহযোগী সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, গাজার মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই শিশু। যারা দিন দিন ট্রমাটাইজ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং প্রতিনিয়ত অবহেলার ফলে শিশুদের এ অবস্থা হচ্ছে।