আশাবাদী হতে চান বিনিয়োগকারীরা
বছরের প্রথম দিন ভালোই কাটাল পুঁজিবাজার
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মন্দায় ধুঁকতে থাকা পুঁজিবাজারে কিছুটা আশার আলো দেখা গেলে। নতুন বছরের প্রথমদিন। গত ক’দিন টানা পতনের শিকার হলেও গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। দিনের শুরু থেকে বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়া একপ্রকার সাবলিলভাবেই লেনদেন শেষ করায় বাজারগুলোতে সব সূচকেরই উন্নতি ঘটে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে নতুন বছরের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিগত বছরগুলোর পুঁজিবাজার আচরণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বছরের শেষ সপ্তাহে এসে বরাবরই সূচকের উন্নতি ঘটে। আবার নতুন বছরের শুরুতে পুনরায় নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হয় বাজার। কিন্তু এবার তার উল্টোটাই দেখা যায়। ধারাবাহিক পতনের মধ্যে বছর পার করলেও নতুন বছরের শুরুতে এসে বাজার আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটল। সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষই মনে করেন, বড় কোনো অঘটন না ঘটলে বাজারের এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন থেকে নানা কারণে এক ধরনের স্থবিতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল বাজারগুলো। মনে করা হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তেই ঘুরে দাঁড়াবে বাজার। গতকালের বাজার আচরণকে তারই সূচনা মনে করতে চান বাজারের সব স্টেকহোল্ডার এবং বিনিয়োগকারীরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৫ দশমিক ২৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সকালে ৪ হাজার ৮৬৫ দশমিক ৩৩ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিন শেষে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯১০ দশমিক ৬১ পয়েন্টে। দশ কর্মদিবস পর ডিএসইর প্রধান সূচকটি আবার ৪ হাজার ৯০০ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করল। গতকাল লেনদেন শুরুর এক ঘণ্টা পর বেলা ১১টায় সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯০৭ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৪২ পয়েন্ট। এ সময় মৃদু বিক্রয়চাপ তৈরি হলে সূচক কিছুটা নিম্নমুখী হয়ে যায়। তবে এ বিক্রয়চাপ সূচককে তেমন নিচে নামাতে পারেনি। বেলা পৌনে ১টার দিকে সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯১৫ পয়েন্টে যখন ডিএসই সূচকের উন্নতি ছিল ৫২ পয়েন্টের বেশি। শেষদিকে এসে মুনাফা তুলে নেয়ার চাপে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের কিছু অংশ হারায় ডিএসই।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এদিন ৯৬ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এখনো সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৯৫ দশমিক ৫১ ও ৫৭ দশমিক ২১ পয়েন্ট।
গতকালের বাজার আচরণে কমবেশি আশাবাদী ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। সামনের দিনগুলোতে এ ধারা অব্যাহত থাকবে এমনটি আশা করতে চান তারা। কারণ দীর্ঘ মন্দার পর একটি ভালো পুঁজিবাজারের প্রত্যাশা তাদের দীর্ঘদিন থেকে। কিন্তু কোনো না কোনো অঘটনের কারণে এতদিন এটা হয়ে ওঠেনি। এখন সামনে নির্বাচন। একটি নতুন সরকার আসার অপেক্ষায় গোটা জাতি। এ সময় বাজারকে সামনে রেখে নতুন নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে আসতে পারেন। আর এটা ঘটলে আগামী দিন বাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতেই পারে।
পুঁজিাবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারও এমনটিই মনে করেন। তারা মনে করেন, বরাবরই নির্বাচনের আগে পরে বাজার পরিস্থিতি ভালো থাকে। এবারো তাই থাকতে পারে। তবে এর জন্য নির্বাচনমুখী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত থাকতে হবে। সরকার বিষয়টির নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে পুঁজিবাজার নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরে আসতে পারে। এক্ষেত্রে আরো নতুন বিনিয়োগকারী বাজারে যুক্ত হতে পারেন।
গতকালের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সম্প্রতি মৌলভিত্তির যেসব কোম্পানি দরপতনের শিকার ছিল গতকাল তারা হারানো দরের একটি অংশ ফিরে পেতে দেখা যায়। অপর দিকে দুর্বল কোম্পানিগুলো গতকাল বেশিরভাগই দর হারায়। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ব্যাংক ও ডিএসইর লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে। আর ব্যাংকিং খাতের কয়েকটি কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধিই দুই বাজারের সূচককে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে।
গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের ওরিয়ন ইনফিউশন। ১৬ কোটি ৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৪ লাখ ৫৫ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৫ কোটি ২০ লাখ টাকায় ৬৫ লাখ ২৮ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে উত্তরা ব্যাংক উঠে আসে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো যথাক্রমেÑ সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, সিটি ব্যাংক, রহিমা ফুড করপোরেশন, সায়হাম কটন মিলস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, মালেক স্পিনিং ও সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট।
গতকাল মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের কোম্পানি এপেক্স স্পিনিং। এ মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল রূপালী ব্যাংক। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সায়হাম টেক্সটাইলস, মনোস্পুল পেপার, দেশ গার্মেন্টস, এনসিসিবি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ওরিয়ন ইনফিউশন, এনআরবিসি ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক।
ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে ছিল বিবিধ খাতের কোম্পানি আরামিট লিমিটেড। কোম্পানিটি গতকাল ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা দিলে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ দরপতনের শিকার হয়। ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ দর হারিয়ে বস্ত্র খাতের তুং হাই ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে নুরানি টেক্সটাইলস, আইএফআইসি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, ফিনিক্স ফিন্যান্স, সিটি জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও বিডি থাই ফুড।